Home বিশ্ব মরুভূমির বুকে জ্বলছে ‘নরকের দরজা’: তুর্কমেনিস্তানের রহস্যময় দরওয়াজা গ্যাস ক্রাটারের ইতিহাস ও বর্তমান বিস্ময়

মরুভূমির বুকে জ্বলছে ‘নরকের দরজা’: তুর্কমেনিস্তানের রহস্যময় দরওয়াজা গ্যাস ক্রাটারের ইতিহাস ও বর্তমান বিস্ময়

0
মরুভূমির বুকে জ্বলছে ‘নরকের দরজা’: তুর্কমেনিস্তানের রহস্যময় দরওয়াজা গ্যাস ক্রাটারের ইতিহাস ও বর্তমান বিস্ময়
মরুভূমির বুকে জ্বলছে 'নরকের দরজা'; তুর্কমেনিস্তানের কারাকুম মরুভূমির এই বিশাল দরওয়াজা গ্যাস ক্রাটারটি গত ৫৫ বছর ধরে একটানা জ্বলছে।

নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪

৬ জুলাই ২০২৬

প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার এই যুগেও পৃথিবীতে এমন কিছু স্থান রয়েছে, যা মানুষকে প্রকৃতির রহস্য ও ইতিহাসের অদ্ভুত মেলবন্ধনের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তেমনই এক অবিশ্বাস্য এবং রোমাঞ্চকর স্থান হলো মধ্য এশিয়ার দেশ তুর্কমেনিস্তানের কারাকুম মরুভূমি। এই ধূসর ও তপ্ত মরুভূমির ঠিক মাঝখানে বিগত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দাউ দাউ করে জ্বলছে এক বিশাল অগ্নিকুণ্ড। স্থানীয় মানুষ এবং বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে এই স্থানটি পরিচিত “নরকের দরজা” (Door to Hell) নামে, যার অফিশিয়াল নাম ‘দরওয়াজা গ্যাস ক্রাটার’।মরুভূমির প্রখর অন্ধকারের বুকে এই বিশাল জ্বলন্ত গর্তটি দেখতে কেমন, কীভাবে এটি তৈরি হলো এবং কেনই বা গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি—তা নিয়ে বিজ্ঞান ও রোমাঞ্চপ্রিয় পাঠকদের জন্য একটি বিস্তারিত অনুসন্ধান।

দরওয়াজা গ্যাস ক্রাটার কী?

তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশগাবাত থেকে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার উত্তরে কারাকুম মরুভূমির দরওয়াজা নামক গ্রামে এই অদ্ভুত ক্রাটার বা গর্তটি অবস্থিত। এটি মূলত একটি বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র, যা মাটির নিচে ধসে গিয়ে এক বিশাল গর্তের সৃষ্টি করেছে।

এই গর্তটির ব্যাস প্রায় ২৩০ ফুট (৭০ মিটার) এবং গভীরতা প্রায় ৬৫ ফুট (২০ মিটার)। এই বিশাল এলাকাজুড়ে মাটির নিচ থেকে অনবরত প্রাকৃতিক গ্যাস (মিথেন) বের হচ্ছে এবং তাতে জ্বলছে আগুন। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন মাটির বুক চিরে ফুটন্ত লাভার কোনো হ্রদ জেগে উঠেছে। বিশেষ করে রাতের বেলা যখন মরুভূমির চারপাশ নিখাদ অন্ধকারে ডুবে যায়, তখন এই ক্রাটারের লাল-কমলা আগুনের আভা কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যায়।

‘নরকের দরজা’ সৃষ্টির নেপথ্যের ইতিহাস: বিজ্ঞানীদের একটি ভুল

এই বিস্ময়কর অগ্নিকুণ্ডটি কিন্তু কোনো প্রাকৃতিক আগ্নেয়গিরি নয়, বরং এটি মানুষের একটি ছোট ভুল এবং বৈজ্ঞানিক অনুমানের ফসল। এর ইতিহাস ঘাঁটলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৭১ সালে, যখন তুর্কমেনিস্তান তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (USSR) অংশ ছিল।

সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধান:

১৯৭১ সালে সোভিয়েত প্রকৌশলী ও ভূবিজ্ঞানীদের একটি দল কারাকুম মরুভূমির এই অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পান। তারা সেখানে গ্যাস উত্তোলনের জন্য ড্রিলিং বা খনন কাজ শুরু করেন। কিন্তু খনন প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে ভূগর্ভস্থ মাটির ভেতরের ফাঁপা কাঠামোর কারণে ওপরের বিশাল অংশ ধসে পড়ে। এতে ড্রিলিং রিগসহ সমস্ত যন্ত্রপাতি মাটির নিচে তলিয়ে যায় এবং এক বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়।

আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত:

সৌভাগ্যবশত এই দুর্ঘটনায় কেউ মারা যাননি, তবে বিজ্ঞানীরা এক নতুন বিপদের মুখোমুখি হন। গর্তটি থেকে বিপুল পরিমাণে বিষাক্ত মিথেন গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এই গ্যাস আশেপাশে ছড়িয়ে পড়লে মরুভূমির পরিবেশ এবং স্থানীয় বন্যপ্রাণী ও মানুষের জীবনের জন্য তা মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াত।

এই বিষাক্ত গ্যাসের বিস্তার রোধ করার জন্য বিজ্ঞানীরা একটি সহজ উপায় বেছে নেন। তারা ভাবলেন, গর্তের গ্যাসে আগুন ধরিয়ে দিলে তা পুড়ে শেষ হয়ে যাবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, সেখানে যে পরিমাণ গ্যাস রয়েছে তা বড়জোর কয়েক সপ্তাহ বা বড়জোর এক মাসের মধ্যে পুড়ে শেষ হয়ে যাবে এবং আগুন আপনআপনিই নিভে যাবে।

৫০ বছরের বিস্ময়:

কিন্তু প্রকৃতির হিসাব ছিল ভিন্ন। বিজ্ঞানীদের সেই হিসাবকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে ১৯৭১ সালে জ্বালানো সেই আগুন আজ ২০২৬ সালেও একইভাবে জ্বলছে। গত ৫৫ বছর ধরে দিন-রাত এক সেকেন্ডের জন্যও এই আগুন নিভেনি। মাটির নিচে ঠিক কতটা বিশাল গ্যাসের মজুদ রয়েছে, তা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক পরম রহস্য।

পর্যটকদের জন্য এক অবিশ্বাস্য ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা

রহস্যময় এই “নরকের দরজা” বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এবং রোমাঞ্চকর পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটক এই জ্বলন্ত গর্তটি দেখতে তুর্কমেনিস্তানে আসেন।

কারাকুম মরুভূমির ক্যাম্পিং:

মরুভূমির চরম আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে জিপ গাড়ি নিয়ে পর্যটকেরা এখানে পৌঁছান। এখানকার মূল আকর্ষণ হলো রাতের বেলার ক্যাম্পিং। ক্রাটারের কাছাকাছি নিরাপদ দূরত্বে তাঁবু খাটিয়ে পর্যটকেরা রাত কাটান। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে মরুভূমির বুকে আগুনের এই লেলিহান শিখা দেখা এবং আগুনের গর্জন শোনার অভিজ্ঞতাকে অনেকেই “ভিনগ্রহের অনুভূতি” বলে আখ্যায়িত করেছেন। এখান থেকে নির্গত তাপ এতটাই তীব্র যে, এর একদম কিনারায় কয়েক মিনিটের বেশি দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব।

পরিবেশগত উদ্বেগ ও আগুন নেভানোর প্রচেষ্টা

দেখতে আকর্ষণীয় হলেও, দরওয়াজা গ্যাস ক্রাটার পরিবেশের জন্য মোটেও ইতিবাচক নয়। একটানা এত বিশাল পরিমাণ মিথেন গ্যাস পুড়ে বায়ুমণ্ডলে কার্বন নির্গমন করছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া, বিপুল পরিমাণ মূল্যবান প্রাকৃতিক গ্যাস এভাবে পুড়ে নষ্ট হওয়া দেশের অর্থনীতির জন্যও এক বড় ক্ষতি।এর আগে বিভিন্ন সময়ে তুর্কমেনিস্তান সরকার এই আগুন নেভানোর এবং গ্যাস ক্ষেত্রটিকে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করার পরিকল্পনা করেছিল। ২০২২ সালেও দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এই নরকের দরজা বন্ধ করার এবং আগুন নেভানোর জন্য বিজ্ঞানীদের উপায় খোঁজার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে ভূগর্ভস্থ বিপুল গ্যাসের চাপ এবং টেকনিক্যাল জটিলতার কারণে আজও এই আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।

তুর্কমেনিস্তানের দরওয়াজা গ্যাস ক্রাটার বা ‘নরকের দরজা’ মানব ইতিহাসের এমন এক অনন্য নিদর্শন, যা বিজ্ঞানীদের ভুল থেকে তৈরি হলেও আজ পৃথিবীর অন্যতম বড় প্রাকৃতিক আশ্চর্যে পরিণত হয়েছে। এটি যেমন আমাদের মনে করিয়ে দেয় মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রকৃতির অপরিসীম শক্তির কথা, তেমনি আকর্ষণ করে পৃথিবীর রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষদের। যতক্ষণ না পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই আগুন নেভানো সম্ভব হচ্ছে, ততক্ষণ মরুভূমির বুকে এই জ্বলন্ত নরকের দরজা মানবজাতিকে এভাবেই প্রতিনিয়ত মুগ্ধ এবং বিস্মিত করে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here