নিউজ ডেস্ক || পাবনা নিউজ ২৪ ৮ জুলাই, ২০২৬
আটলান্টা, জর্জিয়া: ফুটবল বিশ্ব গতকাল রাতে আরও একবার সাক্ষী হলো এক অবিশ্বাস্য, অবিশ্বাস্য এবং শ্বাসরুদ্ধকর মহাকাব্যের। ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর নকআউট পর্বে মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও মাত্র ১১ মিনিটের এক অতিমানবীয় টর্নেডোতে ৩-২ ব্যবধানের এক অলৌকিক জয় ছিনিয়ে নিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আটলান্টা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে আলবিসেলেস্তেরা যখন টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার চরম দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই লিওনেল মেসির নেতৃত্বে জেগে ওঠে স্কালোনির শিষ্যরা। ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিওনেল মেসি এবং ইনজুরি টাইমে এনজো ফার্নান্দেজের জাদুকরী গোলে মিশরকে স্তব্ধ করে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা।
ফারাওদের দাপট এবং স্তব্ধ আটলান্টা
ম্যাচের শুরু থেকেই এক সুসংহত রক্ষণভাগ এবং কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসেছিল মিশর। ম্যাচের ১৫ মিনিটেই পুরো স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেয় মরুর দেশ মিশর। কর্নার থেকে উড়ে আসা চমৎকার এক বল আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাঁকি দিয়ে দারুণ হেডে জালে জড়ান মিশরের ইয়াযের ইব্রাহিম (১-০)।পিছিয়ে পড়ে গোল শোধে মরিয়া আর্জেন্টিনা ম্যাচের ২০ মিনিটেই সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পায়। ডি-বক্সে হুলিয়ান আলভারেজ ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু ফুটবল ঈশ্বর যেন প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার পক্ষে ছিলেন না। লিওনেল মেসির নেওয়া স্পট-কিকটি বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দেন মিশরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের। এটি ছিল এই বিশ্বকাপে মেসির দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস। প্রথমার্ধের বাকিটা সময় আলবিসেলেস্তেরা বল দখলে আধিপত্য দেখালেও মিশরের জমাট রক্ষণ ভাঙতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
দ্বিতীয়ার্ধে মিশরের দ্বিতীয় আঘাত ও আর্জেন্টিনার বিপর্যয়
দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর বদলে আরও বড় ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে মিশরের মহাতারকা মোহাম্মদ সালাহর পাস থেকে এক নিখুঁত কাউন্টার অ্যাটাকে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে চূর্ণবিচূর্ণ করে বল জালে পাঠান মোস্তফা জিকো (২-০)। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের চোখে তখন বিদায়ের অশ্রু। সময় যত গড়াচ্ছিল, আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ততটাই ফিকে হয়ে আসছিল।
১১ মিনিটের সেই অলৌকিক প্রত্যাবর্তন
ফুটবলে একটা কথা প্রচলিত আছে—”আর্জেন্টিনাকে কখনই মৃত ভেবে ভুল করতে নেই।” ম্যাচের ৭৯ মিনিট থেকে শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক তান্ডব।
প্রথম কামড় (৭৯ মিনিট): এনজো ফার্নান্দেজের চমৎকার এক ক্রস থেকে বাতাসে ভেসে উঠে বুলেট গতিতে হেডে মিশরের জাল কাঁপান ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান ‘কুটি’ রোমেরো। স্কোরলাইন তখন ২-১। এই এক গোলেই প্রাণ ফিরে পায় আলবিসেলেস্তেরা।
অধিনায়কের প্রায়শ্চিত্ত (৮৩ মিনিট): রোমেরোর গোলের মাত্র ৪ মিনিট পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। হুলিয়ান আলভারেজের ডিফেন্স-চেরা পাস ডি-বক্সে খুঁজে নেয় ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসিকে। আলতো এক টাচে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মিশরের গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান এলএমটেন (২-২)। পেনাল্টি মিসের খেসারত দিয়ে দলকে সমতায় ফিরিয়ে বুনো উল্লাসে মাতেন মেসি। এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এককভাবে শীর্ষে চলে গেলেন তিনি।
ইনজুরি টাইমে এনজোর রূপকথা
২-২ গোলে সমতা আসার পর ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ফুটবল ইতিহাসের ৩,০০০তম গোলের মাইলফলক ছুঁয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এনজো ফার্নান্দেজ। ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে যোগ করা ইনজুরি সময়ের ৯৩ মিনিটে (৯০+৩’) লাউতারো মার্টিনেজের মাপা ক্রস থেকে দৌড়ে এসে এক দর্শনীয় ডাইভিং হেডে বল মিশরের জালে পাঠান এই চেলসি মিডফিল্ডার।পুরো আটলান্টা স্টেডিয়াম তখন উল্লাসের আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়। ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা দল ম্যাচ জিতে নেয় ৩-২ ব্যবধানে। এই জয়ের সাথে সাথেই রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর ডাগআউটে লিওনেল মেসির চোখের জলই বলে দিচ্ছিল, মাঠের ভেতরে কতটা মানসিক চাপ ও আবেগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এই জীবন্ত কিংবদন্তিকে।
ম্যাচ পরিসংখ্যান: পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার বল দখল ছিল ৬১ শতাংশ। তারা মিশরের পোস্ট লক্ষ্য করে মোট ১৭টি শট নেয়, যার মধ্যে ৭টি ছিল অন-টার্গেট। পক্ষান্তরে মিশর মাত্র ৪টি শট নিতে সক্ষম হয়।
কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড
মিশরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রতিপক্ষ ইউরোপের পরাশক্তি সুইজারল্যান্ড, যারা কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে। আগামী ১২ জুলাই (বাংলাদেশ সময় ভোর ৬:৩০ মিনিটে) সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে মেসি-স্কালোনির আর্জেন্টিনা।