Home লাইফস্টাইল সংস্কৃতি মাকু আর সুতোর জুগলবন্দি: পাবনার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প ও শাড়ির অন্দরমহল

মাকু আর সুতোর জুগলবন্দি: পাবনার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প ও শাড়ির অন্দরমহল

0
মাকু আর সুতোর জুগলবন্দি: পাবনার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প ও শাড়ির অন্দরমহল
পাবনার একটি ঐতিহ্যবাহী তাঁত পল্লীতে মাকু ও সুতোর সাহায্যে নিপুণভাবে শাড়ি বুনছেন একজন স্থানীয় কারিগর।

ভোর চারটে বাজতেই যখন কুয়াশা কিংবা ভোরের আলো শহরকে আলতো করে ছুঁয়ে যায়, তখন পাবনার কিছু জনপদে শুরু হয় এক অদ্ভুত ছন্দময় সঙ্গীত। ‘খট-খট, খট-খট’— এই শব্দ কোনো যান্ত্রিক কোলাহল নয়, এ হলো সুতো আর মাকুর পরম যত্নে একে অপরকে জড়িয়ে ধরার আওয়াজ। এই আওয়াজই জানান দেয়, পাবনার তাঁতি পাড়াগুলো জেগে উঠেছে। যেখানে প্রতিটা সুতোর ভাঁজে ভাঁজে বোনা হয় বাঙালি নারীর বারো হাতের শাড়ির স্বপ্ন।

পাবনার ঈশ্বরদী, চাটমোহর, সুজানগর কিংবা সদর উপজেলার দোগাছি—এই অঞ্চলগুলোর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাহারি রঙের সুতো, ড্রাম আর তাঁত মেশিনের ব্যস্ততা। পাবনার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি এই জনপদের মানুষের রক্তে মিশে থাকা এক প্রাচীন শিল্পকলা।

আজ ‘পাবনা নিউজ ২৪’-এর বিশেষ ফিচারে আমরা ডুব দেবো পাবনার এই গৌরবময় শাড়ির অন্দরমহলে, জানবো এর পেছনের চড়াই-উতরাইয়ের গল্প।

শিকড়ের খোঁজে: পাবনার তাঁতের ইতিহাস

পাবনার তাঁত শিল্পের ইতিহাস এক বা দুই দশকের নয়, এটি শত বছরের পুরোনো। ইতিহাস বলে, ব্রিটিশ আমল থেকেই পাবনা অঞ্চলের তৈরি সুতি কাপড় ও শাড়ি অনন্য গুণগত মানের জন্য সমাদৃত ছিল। এখানকার তাঁতিদের হাতের কাজের সুখ্যাতি এতটাই ছিল যে, কোলকাতার বাবুদের ঘরের নারীদের প্রথম পছন্দই ছিল পাবনার সুতি শাড়ি।

পরবর্তীতে দেশভাগের পর এবং স্বাধীন বাংলাদেশে এই শিল্প আরও বিকশিত হয়। বিশেষ করে পাবনার দোগাছি এবং ঈশ্বরদীর তাঁতের শাড়ি নিজস্ব একটা ব্র্যান্ড তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। সুতোর কাউন্ট, সুক্ষ্ম বুনন আর রঙের টেকসই গুণের কারণে এই শাড়িগুলো অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে আলাদা।

পাবনার সিগনেচার:

এখানকার সুতি (Cotton) ও হাফ-সিল্ক শাড়ির জমিন এতটাই নরম হয় যে, গ্রীষ্মপ্রধান এই দেশে নারীদের কাছে এর চেয়ে আরামদায়ক পোশাক আর দ্বিতীয়টি নেই।

এক টুকরো সুতো থেকে বারো হাতের শাড়ি: পর্দার পেছনের কারিগর

আমরা যখন বাজারে গিয়ে একটা চমৎকার পাবনার তাঁতের শাড়ি কিনি, তখন হয়তো শুধু এর ডিজাইনটাই দেখি। কিন্তু এই শাড়ির পেছনে লুকিয়ে থাকে এক একটি পরিবারের দিন-রাতের ক্লান্তিহীন পরিশ্রম।

একটি শাড়ি তৈরির প্রক্রিয়াটি মোটেও সহজ নয়। বাজার থেকে সুতো কিনে আনার পর শুরু হয় প্রথম ধাপ—রঙ করা। কেমিক্যাল আর গরম পানির নিখুঁত মিশ্রণে সুতোয় রঙ পাকা করা হয়। এরপর সেই সুতো রোদে শুকিয়ে, চরকার সাহায্যে নলি বা মাকু (Shuttle)-তে ভরা হয়।

সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো ‘তাঁত সানা’ বা নকশা সেট করা। কম্পিউটারের গ্রাফিক্সের মতো করেই তাঁতিরা তাদের মাথায় বা গ্রাফ পেপারে আঁকা নকশা সুতোর বিন্যাসে সাজিয়ে নেন। এরপর শুরু হয় মূল বুনন। একজন দক্ষ তাঁতি দিনে সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩টি সাধারণ শাড়ি বুনতে পারেন। আর যদি সেটা কোনো এক্সক্লুসিভ ডিজাইনের জামদানি বা সিল্ক শাড়ি হয়, তবে একটি শাড়ি শেষ করতেই কেটে যায় কয়েক দিন থেকে এক সপ্তাহ!

দোগাছির শাড়ি এবং পাবনার হাটের ঐতিহ্য

পাবনার তাঁত শিল্পের কথা বলতে গেলে ‘দোগাছি’ গ্রামের নাম না নিলে লেখাটি অপূর্ণ থেকে যাবে। দোগাছির সুতি শাড়ি যেন এক একটি জীবন্ত ক্যানভাস। লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি সুতোর পাড় আর জমিনে ছোট ছোট বুটিদার নকশা—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব সমন্বয়।

আর এই শাড়িগুলোর সবচেয়ে বড় বাজার বসে পাবনার ঐতিহ্যবাহী হাটগুলোতে। আতাইকুলা হাট, চাটমোহর হাট কিংবা ঈশ্বরদীর বাজারগুলোতে যখন হাটের দিন আসে, তখন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা এসে ভিড় জমান। প্রতি সপ্তাহে কোটি কোটি টাকার শাড়ি ও লুঙ্গি এই হাটগুলো থেকে বিক্রি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ সারা দেশে। এমনকি এই শাড়ির একটা বড় অংশ এখন নিঃশব্দে রফতানি হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও।

আধুনিকতার ছোঁয়া ও পাওয়ার লুমের চ্যালেঞ্জ

সময়ের সাথে সাথে পাবনার তাঁত শিল্পেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। পুরোনো হস্তচালিত তাঁত (Handloom)-এর পাশাপাশি এখন জায়গা করে নিয়েছে বিদ্যুৎচালিত ‘পাওয়ার লুম’ (Power Loom)। পাওয়ার লুমের কারণে উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ, খরচও কমেছে।

তবে এর একটা নেতিবাচক দিকও আছে। পাওয়ার লুমের ভিড়ে খাঁটি হস্তচালিত তাঁতের সেই আদি ও অকৃত্রিম ছোঁয়া কিছুটা হলেও হারাতে বসেছে। তা সত্ত্বেও, রুচিশীল ক্রেতাদের কাছে আজও হাতে বোনা খাঁটি সুতি শাড়ির কদর বিন্দুমাত্র কমেনি। ক্রেতারা জানেন, মেশিনের নিখুঁত কাজের চেয়ে মানুষের হাতের ভালোবাসায় বোনা শাড়ির মর্যাদা অনেক বেশি।

শেষ কথা: ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই

পাবনার তাঁত শিল্প আজ নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সুতোর দাম বৃদ্ধি, রঙ ও রাসায়নিকের চড়া মূল্য এবং অনেক সময় ন্যায্য মূল্যের অভাব—সব মিলিয়ে অনেক তাঁতি পরিবার এখন এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন।

তবুও যারা বাপ-দাদার এই ঐতিহ্যকে বুকে আঁকড়ে ধরে আছেন, তারা আসলে আমাদের সংস্কৃতির এক একজন অতন্দ্র প্রহরী। পাবনার শাড়ি কেবল একটি পরিধেয় বস্ত্র নয়, এটি আমাদের পরিচয়, আমাদের গর্ব। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সঠিক বিপণন ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।

পাবনার তাঁতিদের এই সুনিপুণ হাতগুলো সচল থাকুক, মাকুর খটখট শব্দে মুখরিত থাকুক আমাদের গ্রামগুলো—পাবনা নিউজ ২৪-এর পক্ষ থেকে এই শিল্পের সাথে জড়িত সকল কারিগরদের প্রতি রইল সশ্রদ্ধ সালাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here