Home ফিচার মাদক-মুদ্রা হিসেবে ইয়াবার রূপান্তর ও নতুন অ্যালার্মিং রিয়েলিটি: বাংলাদেশে অ্যামফিটামিন মাদক জব্দ ৯০% বাড়ার নেপথ্য কারণ

মাদক-মুদ্রা হিসেবে ইয়াবার রূপান্তর ও নতুন অ্যালার্মিং রিয়েলিটি: বাংলাদেশে অ্যামফিটামিন মাদক জব্দ ৯০% বাড়ার নেপথ্য কারণ

0
মাদক-মুদ্রা হিসেবে ইয়াবার রূপান্তর ও নতুন অ্যালার্মিং রিয়েলিটি: বাংলাদেশে অ্যামফিটামিন মাদক জব্দ ৯০% বাড়ার নেপথ্য কারণ
দেশের স্বার্থে ও নিজের স্বার্থে মাদককে 'না' বলুন। ছবি: সংগৃহীত।

নিউজ ডেস্ক || পাবনা নিউজ ২৪

২৯ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশে মাদক চোরাচালান ও মাদকাসক্তির ধরন দিন দিন অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করছে। প্রচলিত মাদক ব্যবসার ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশের অপরাধ জগতে এখন নতুন ট্রেন্ড হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘মাদক-মুদ্রা’ (Drug Currency) বা ইয়াবাকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা। সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মাদক সিন্ডিকেটগুলো এখন অর্থ লেনদেনের বিকল্প হিসেবে সরাসরি ইয়াবা ব্যবহার করছে। একই সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে ‘অ্যামফিটামিন-জাতীয় উত্তেজক’ (ATS – Amphetamine-Type Stimulants) মাদক জব্দের পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে ৯০.৫৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদক সিন্ডিকেটের এই নতুন কৌশল এবং দেশে কৃত্রিম মাদকের এই ভয়াবহ আগ্রাসনের পেছনে আসল কারণ কী, তা নিয়ে একটি বিস্তারিত ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

মাদক-মুদ্রা (Drug Currency): ইয়াবা যখন লেনদেনের মাধ্যম

‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, তা হলো মাদক-মুদ্রা হিসেবে ইয়াবার ব্যবহার। আগে মাদক কেনাবেচার জন্য নগদ টাকা, হুন্ডি বা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করা হতো। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারির কারণে এখন মাদক ব্যবসায়ীরা নিজেদের মধ্যে লেনদেনের জন্য সরাসরি ইয়াবাকেই ‘মুদ্রা’ বা কারেন্সি হিসেবে ব্যবহার করছে।

এটি কীভাবে কাজ করে?

বিকল্প অর্থনীতি: আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক সীমান্ত দিয়ে যখন এক গ্যাং অন্য গ্যাংয়ের কাছ থেকে কোনো অবৈধ পণ্য বা অস্ত্র কেনে, তখন তারা কাগজের টাকার বদলে নির্দিষ্ট সংখ্যক ইয়াবার প্যাকেট বা বড় চালান বুঝিয়ে দেয়।

ট্র্যাকিং এড়ানো: ইয়াবা নিজে এক হাত থেকে অন্য হাতে গেলে কোনো ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা ব্যাংক ট্রেইল থাকে না। ফলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষে এই বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক লেনদেন ট্র্যাক করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

মূল্য স্থায়িত্ব: অপরাধীদের আন্ডারওয়ার্ল্ডে ইয়াবার একটি নির্দিষ্ট ও স্থিতিশীল বাজারমূল্য রয়েছে, যার কারণে এটিকে তারা সোনার বার বা বৈদেশিক মুদ্রার মতোই নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য বিনিময় মাধ্যম হিসেবে গণ্য করছে।

পরিসংখ্যানের ফোকাস: অ্যামফিটামিন মাদক জব্দ কেন ৯০.৫৮% বাড়ল?

অ্যামফিটামিন (Amphetamine) হলো মূলত ইয়াবা এবং আইস (Crystal Meth)-এর মূল কাঁচামাল। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী স্নায়ু উত্তেজক রাসায়নিক উপাদান। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (DNC), পুলিশ, র‍্যাব এবং বিজিবি-র সাম্প্রতিক সমন্বিত অভিযানের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে কাঁচামাল বা পিওর ফর্মে অ্যামফিটামিন জাতীয় মাদক জব্দের হার আগের তুলনায় ৯০.৫৮% বেড়েছে।

এই ব্যাপক বৃদ্ধির কারণসমূহ:

স্থানীয়ভাবে ল্যাব তৈরি: গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, শুধু মিয়ানমার থেকে তৈরি ইয়াবা আমদানির ওপর নির্ভর না করে, দেশের ভেতরেই কিছু গোপন ল্যাবরেটরিতে এই অ্যামফিটামিন পাউডার ব্যবহার করে নকল বা হাই-ডোজের ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ তৈরি করা হচ্ছে।

আইসের (Ice) আগ্রাসন: ক্রিস্টাল মেথ বা আইস মূলত শতভাগ বিশুদ্ধ অ্যামফিটামিন। দেশের উচ্চবিত্ত ও তরুণ সমাজের মধ্যে আইসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এর চোরাচালান ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে জব্দের পরিমাণও ৯০ শতাংশের বেশি লাফিয়েছে।

কঠোর নজরদারি ও ডগ স্কোয়াড: টেকনাফ, কক্সবাজার এবং পার্বত্য সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের আধুনিক স্ক্যানার এবং ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ফলে বড় বড় চালানগুলো আগের চেয়ে বেশি ধরা পড়ছে।

সমাজ ও জনস্বাস্থ্যে এর মারাত্মক পরিণতি

অ্যামফিটামিন-জাতীয় মাদকের এই বিপুল বিস্তার বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি নীরব পারমাণবিক বোমার মতো কাজ করছে।

মানসিক স্বাস্থ্যের চরম বিপর্যয়: অ্যামফিটামিন সরাসরি মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে (CNS) হাইপার-অ্যাক্টিভ করে তোলে। এর ফলে ব্যবহারকারীর মধ্যে তীব্র হ্যালুসিনেশন, প্যারানোয়া (অহেতুক সন্দেহ প্রবণতা) এবং চরম হিংস্রতা দেখা দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঘটে যাওয়া অনেক নির্মম হত্যাকাণ্ড ও পারিবারিক সহিংসতার পেছনে এই মাদকের প্রভাব রয়েছে।

অপরাধের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: মাদক-মুদ্রার ব্যবহার বাড়ার অর্থ হলো অপরাধ জগত নিজেদের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। এটি দেশের মূল ধারার অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি।

যুবসমাজের অকাল মৃত্যু: অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যামফিটামিন গ্রহণের ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং লিভার-কিডনি বিকল হয়ে শত শত তরুণ অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

আইন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চ্যালেঞ্জ

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অক্লান্ত পরিশ্রম করলেও এই আধুনিক মাদক চক্রকে রুখতে বেশ কিছু আইনি ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে:

ডিজিটাল ডার্ক ওয়েবের ব্যবহার: বর্তমানে বড় বড় মাদক ডিলাররা সরাসরি যোগাযোগের বদলে ‘ডার্ক ওয়েব’ এবং এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ (যেমন সিগন্যাল বা টেলিগ্রাম) ব্যবহার করে অর্ডার নিচ্ছে এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন করছে।

সীমান্তের ভৌগোলিক জটিলতা: মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং নাফ নদীর সীমান্ত এলাকা পুরোপুরি সিল করা অত্যন্ত কঠিন, যা মাদক কারবারিরা রুট হিসেবে ব্যবহার করে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে প্রথাগত অভিযানের পাশাপাশি কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিতে হবে:

 আর্থিক গোয়েন্দা নজরদারি (BFIU): মাদক সিন্ডিকেটের হুন্ডি চক্র ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অবৈধ লেনদেন রুখতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

 আন্তর্জাতিক সীমান্ত কূটনীতি: মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং মাদক রুট বন্ধ করতে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

 সামাজিক সচেতনতা ও পুনর্বাসন: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পরিবারে মাদকের কুফল নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সাথে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন ও খরচ কমানো জরুরি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here