Home লাইফস্টাইল ভ্রমণ মারায়ান তং ট্র্যাকিং গাইড: মেঘের রাজ্য আর তারার মেলার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা

মারায়ান তং ট্র্যাকিং গাইড: মেঘের রাজ্য আর তারার মেলার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা

0
মারায়ান তং ট্র্যাকিং গাইড: মেঘের রাজ্য আর তারার মেলার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা
কষ্টের ট্র্যাকিং শেষে যখন এই ভিউটা সামনে আসে, তখন সব ক্লান্তি এক পলকে উধাও হয়ে যায়।

নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪

কক্সবাজারের চেনা সমুদ্র সৈকত কিংবা সাজেক ভ্যালির কৃত্রিম বাণিজ্যিক সৌন্দর্যের ভিড় পেরিয়ে যারা একটু অন্যরকম, রোমাঞ্চকর এবং অফবিট জায়গার খোঁজে আছেন, তাদের জন্য বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা আকর্ষণ হলো ‘মারায়ান তং’ (Marayan Thong)। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় অবস্থিত এই পাহাড়ের চূড়াটি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে এক টুকরো স্বর্গ। ১৬৪০ ফুট উচ্চতার এই পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা যায় চারপাশের দিগন্ত বিস্তৃত মেঘের ভেলা, যা চোখের পলকে ভুলিয়ে দেয় নাগরিক জীবনের সব ক্লান্তি ও ব্যস্ততা।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে ট্র্যাকিং ও ক্যাম্পিংয়ের যে জোয়ার এসেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এই পাহাড়টি। মারায়ান তং চেরী বা মারায়ান তং নামে পরিচিত এই পর্বতশৃঙ্গটি তার অকৃত্রিম প্রাকৃতিক রূপ ও শান্ত পরিবেশের কারণে ভ্রমণপিপাসুদের মনের খোরাক জোগাচ্ছে।

কেন অনন্য মারায়ান তং পাহাড়?

আমাদের দেশের বেশিরভাগ পর্যটন কেন্দ্রেই এখন আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, গড়ে উঠেছে বড় বড় রিসোর্ট। কিন্তু মারায়ান তং এখনো তার আদিম, শান্ত ও বুনো রূপটি ধরে রেখেছে। যান্ত্রিক সভ্যতার কোনো কোলাহল এখানে পৌঁছাতে পারেনি। এই পাহাড়ের মূল আকর্ষণ মূলত তিনটি বিশেষ দিক, যা অন্য যেকোনো পর্যটন কেন্দ্র থেকে একে সম্পূর্ণ আলাদা করে তোলে:

মেঘের সমুদ্র ও চোখ জুড়ানো ভিউ

মারায়ান তং পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে মনে হবে আপনি কোনো এক অলৌকিক মেঘের ওপর ভেসে আছেন। বিশেষ করে বর্ষা, শরৎ কিংবা শীতের সকালে চারপাশ ঘন সাদা তুলোর মতো মেঘে ঢেকে যায়। পাহাড়ের নিচে এঁকেবেঁকে বয়ে চলা রূপালী মাতামুহুরী নদী এবং দূরের ছোট-বড় পাহাড়ের সারি মিলে এক অবাস্তব সুন্দর দৃশ্যের অবতারণা করে। যখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে, তখন মেঘের বুক চিরে সূর্যের প্রথম রশ্মি নেমে আসে পাহাড়ের গায়ে। এই দৃশ্য দেখার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

ক্যাম্পিং এবং তারার মেলা (Night Camping & Stargazing)

অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় তরুণদের কাছে মারায়ান তং-এর প্রধান জনপ্রিয়তার কারণ হলো এখানে রাত কাটানোর সুযোগ। পাহাড়ের চূড়ায় তাবু (Tent) খাটিয়ে রাত্রিযাপন করার অভিজ্ঞতা এক কথায় চমৎকার। দূষণমুক্ত পাহাড়ি আকাশে রাতের বেলা লাখ লাখ তারার মেলা বসে। শহরের আকাশে যে তারাগুলো হারিয়ে গেছে, এখানে তারা যেন অনেক কাছ থেকে ডানা মেলে। ভাগ্য ভালো হলে এবং আকাশ পরিষ্কার থাকলে দেখা মিলতে পারে ছায়াপথ বা মিল্কি ওয়েরও (Milky Way)। পাহাড়ের চূড়ায় হিমশীতল হাওয়া, হালকা কুয়াশা আর খোলা আকাশের নিচে বন্ধুদের সাথে গান গাওয়া কিংবা বার্বিকিউ করার আনন্দ ক্যাম্পিংয়ের অভিজ্ঞতাকে আজীবন স্মরণীয় করে রাখে।

ম্রো জনজাতির ভিন্ন সংস্কৃতি ও জীবনধারা

মারায়ান তং পাহাড়ের পাদদেশে এবং এর আশেপাশে আদিবাসী ম্রো (Mro) সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। তাদের মাচাং ঘর, সরল জীবনযাপন, পাহাড়ের ঢালে জুম চাষ এবং নিজস্ব সংস্কৃতি যেকোনো পর্যটককে মুগ্ধ করবে। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর পথে তাদের এই বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে। পাহাড়ি শিশুদের নিষ্পাপ হাসি আর ম্রোদের অতিথি পরায়ণতা এই ভ্রমণকে কেবল একটি সাধারণ আনন্দভ্রমণ না রেখে এক অনন্য মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করে।

মারায়ান তং যাওয়ার উপায় ও ট্র্যাকিং রুট

ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে মারায়ান তং যেতে হলে প্রথমে আসতে হবে কক্সবাজারের চকরিয়া অথবা সরাসরি বান্দরবানের আলীকদমে। যাতায়াত ব্যবস্থা এখন আগের চেয়ে বেশ উন্নত।

চকরিয়া হয়ে: ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী যেকোনো দূরপাল্লার বাসে উঠে চকরিয়া বাস টার্মিনালে নামতে হবে। চকরিয়া থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লোকাল বাস বা চাঁদের গাড়ি (জিপ) আলীকদমের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। আপনাকে নামতে হবে আলীকদমের “আবাসিক” নামক জায়গায়।

আলীকদম থেকে ট্র্যাকিং: আবাসিক এলাকা থেকেই মূলত মারায়ান তং পাহাড়ে ওঠার মূল ট্র্যাকিং রাস্তা শুরু হয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে একজন সাধারণ মানুষের শারীরিক সক্ষমতা ভেদে প্রায় ২.৫ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। রাস্তার প্রথম অংশটি কিছুটা সমতল ও ইটের তৈরি হলেও, ভেতরের এবং ওপরের অংশটি বেশ খাড়া এবং মাটির। বিশেষ করে বর্ষাকালে এই পথ অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে ওঠে, তাই ট্র্যাকিংয়ের সময় ট্র্যাকিং বুট বা ভালো গ্রিপের জুতো পরা অত্যন্ত জরুরি।

ভ্রমণের কিছু জরুরি টিপস ও সতর্কতা

পাহাড়ি ট্র্যাকিং এবং খোলা পাহাড়ে ক্যাম্পিংয়ের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। মারায়ান তং ভ্রমণের সময় নিচের বিষয়গুলো কঠোরভাবে মাথায় রাখা উচিত:

পানি ও শুকনো খাবার: পাহাড়ে ওঠার পুরো রাস্তায় বা পাহাড়ের চূড়ায় কোনো দোকান বা সুপেয় পানির উৎস নেই। পাহাড়ের নিচে শেষ দোকান থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার পানি, স্যালাইন, গ্লুকোজ, খেজুর ও শুকনো খাবার সাথে নিয়ে নিতে হবে।

ক্যাম্পিং সরঞ্জাম ও ফার্স্ট এইড: রাতে থাকার জন্য ভালো মানের উইন্ডপ্রুফ তাবু, স্লিপিং ব্যাগ বা মোটা চাদর এবং ভালো মানের টর্চলাইট বা হেডল্যাম্প সাথে রাখা বাধ্যতামূলক। এর পাশাপাশি ওডোমস (মশা তাড়ানোর ক্রিম) এবং জরুরি কিছু প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধ (প্যারাসিটামল, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, স্যাভলন, ব্যান্ডেজ) সাথে রাখা উচিত।

পরিবেশ রক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পাহাড় আমাদের সম্পদ। পাহাড়ের চূড়ায় প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, পলিথিন বা কোনো বর্জ্য ফেলে পরিবেশ ও পাহাড়ের সৌন্দর্য নষ্ট করা যাবে না। যা কিছু ময়লা হবে, তা একটি নির্দিষ্ট ব্যাগে সংগ্রহ করে নিচে নামিয়ে নিয়ে এসে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে।

আদিবাসীদের প্রতি শ্রদ্ধা: ম্রো সম্প্রদায়ের নিজস্ব নিয়মকানুন ও সংস্কৃতির প্রতি পূর্ণ সম্মান দেখাতে হবে। তাদের মাচাং ঘরে ওঠার আগে বা তাদের কোনো ছবি তোলার আগে অবশ্যই বিনীতভাবে অনুমতি নেওয়া উচিত। এমন কোনো আচরণ করা যাবে না যাতে তাদের শান্তি বিঘ্নিত হয়।

প্রকৃতির এত কাছাকাছি, কোনো কৃত্রিমতা ছাড়া শান্ত পরিবেশে মেঘের মিতালি এবং তারার মেলা দেখার জন্য মারায়ান তং-এর কোনো বিকল্প নেই। যান্ত্রিক জীবন, অফিসের কাজের চাপ কিংবা পড়াশোনার একঘেয়েমি থেকে কয়েকদিনের মুক্তি পেতে ব্যাগ গুছিয়ে ঘুরে আসতে পারেন মেঘের এই রহস্যময় রাজ্য থেকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here