নিউজ ডেস্ক ,পাবনা নিউজ ২৪
যান্ত্রিক জীবনের ইট-পাথরের দেয়াল আর কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে আমরা অনেকেই ছুটে যাই চেনা সব পর্যটন কেন্দ্রে। কিন্তু আমাদের চিরচেনা পর্যটন স্পটগুলোর বাইরেও এই রূপসী বাংলায় লুকিয়ে আছে এমন কিছু চোখ জুড়ানো গোপন স্বর্গরাজ্য, যার সৌন্দর্য যেকোনো ভ্রমণপিয়াসী মানুষকে নিমেষেই মুগ্ধ করতে পারে। তেমনই এক অনন্য, অপার্থিব এবং সাধারণ পর্যটকদের কাছে এখনো কিছুটা অজানা ও অফবিট জায়গার নাম শেরপুরের ‘পানিহাতা তারানি’। ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলায় ভারত সীমান্ত ঘেঁষা এই প্রত্যন্ত অঞ্চলটি যেন প্রকৃতি নিজের হাতে সবুজ পাহাড়, শান্ত নদী আর মেঘের মিতালী দিয়ে সাজিয়েছেন। আপনি যদি কোলাহলমুক্ত শান্ত পরিবেশে পাহাড়ের গায়ে মেঘের খেলা এবং আদিবাসী সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন উপভোগ করতে চান, তবে ২০২৬ সালের এই ভ্রমণ মৌসুমে আপনার বাকেlist-এ সবার ওপরে থাকা উচিত এই চমৎকার স্পটটি।
প্রকৃতি যেখানে রূপের পসরা সাজিয়েছে: পানিহাতার মূল আকর্ষণ
পানিহাতা তারানি নামক এই সীমান্তবর্তী গ্রামে পা রাখলেই মনে হবে আপনি কোনো এক জীবন্ত ক্যানভাসে প্রবেশ করেছেন। এর চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য এক কথায় অতুলনীয়:
লুসাই পাহাড়ের মেঘমালার দৃশ্য: পানিহাতার ঠিক ওপারেই ভারতের মেঘালয়ের তুরা পাহাড় বা লুসাই পাহাড়ের বিস্তীর্ণ পর্বতমালা। উত্তর দিকে তাকালেই দেখা যায় সারি সারি উঁচু পাহাড়, যার বুক চিরে সাদা মেঘের দল অনবরত ভেসে বেড়ায়। কখনো কখনো মনে হয় হাত বাড়ালেই বুঝি ছোঁয়া যাবে সেই মেঘ।
ভোগাই নদীর শান্ত বয়ে চলা: পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে স্বচ্ছ জলের ভোগাই নদী। পাহাড় থেকে নেমে আসা এই নদীর ঠান্ডা পানিতে পা ভিজিয়ে বসে থাকা কিংবা নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ানোর অনুভূতি এক অদ্ভুত মানসিক শান্তি এনে দেয়।
সবুজ পাহাড় আর চিল-পাখির মেলা: নদীর ওপাড়ে ভারতের কাঁটাতারের সীমানা আর এপাড়ে বাংলাদেশের সবুজ পাহাড়ী টিলা। শান্ত এই উপত্যকায় বিকেলে যখন চিল ও বুনো পাখিরা ঝাঁক বেঁধে উড়ে বেড়ায়, তখন সেখানকার নীরবতা এক স্বর্গীয় রূপ ধারণ করে।
আদিবাসী সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার এক অনন্য অভিজ্ঞতা
পানিহাতা তারানি কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই অনন্য নয়, এটি আমাদের দেশের নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা কাছ থেকে দেখার এক দারুণ সুযোগ।এই অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে অত্যন্ত শান্তিতে বসবাস করে আসছে গারো এবং হাজং সম্প্রদায়ের মানুষেরা। পাহাড়ের ঢালে তাদের মাচা তৈরি করা ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ি, নিজস্ব পোশাক-আশাক এবং সরল জীবনযাত্রা যেকোনো শহুরে মানুষকে মুগ্ধ করবে। এখানকার স্থানীয় পাহাড়ি ছড়া বা ঝরনাগুলোর পাশ দিয়ে যখন আদিবাসী নারীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী থামি পরে হেঁটে যায়, তখন তা পুরো পরিবেশকে আরও বেশি জীবন্ত ও রঙিন করে তোলে। এছাড়া এখানে রয়েছে শত বছরের পুরনো একটি চার্চ বা গীর্জা, যা এই অঞ্চলের শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশকে আরও আধ্যাত্মিক করে তুলেছে।
পানিহাতা ভ্রমণের সঠিক সময় ও যাতায়াত ব্যবস্থা
পানিহাতা তারানির রূপ বছরের একেক সময়ে একেক রকম হলেও, ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো বর্ষাকাল এবং শরৎকাল। বর্ষায় পাহাড়গুলো ধুয়ে-মুছে একদম গাঢ় সবুজ হয়ে ওঠে এবং ভোগাই নদী রূপালী জলে যৌবন ফিরে পায়। আবার শরৎকালে পাহাড়ের মাথায় নীল আকাশের বুকে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি দেখতে দারুণ লাগে।
কীভাবে যাবেন?
পাবনা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে আসতে হবে শেরপুর জেলায়। শেরপুর শহর থেকে লোকাল বাস বা সিএনজি চালিত অটোরিকশা নিয়ে পৌঁছাতে হবে নালিতাবাড়ী উপজেলায়। এরপর নালিতাবাড়ী থেকে মাত্র ১৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পানিহাতা তারানি ইকো-ট্যুরিজম স্পট। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় যাতায়াতের রাস্তাগুলো কিছুটা পাহাড়ি আঁকাবাঁকা, যা আপনার ভ্রমণকে আরও বেশি রোমাঞ্চকর করে তুলবে।
অফবিট ট্রাভেলারদের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ
যেহেতু পানিহাতা তারানি এখনো কমার্শিয়াল বা বাণিজ্যিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে খুব বেশি পরিচিত নয়, তাই এখানে ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:
দিনের আলোতেই ফেরা: এটি একদম ভারত সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা হওয়ায় সন্ধ্যার পর সেখানে অবস্থান করা নিরাপদ নয়। তাই বিকেলের সূর্যাস্ত দেখেই নালিতাবাড়ী বা শেরপুর শহরে ফিরে আসা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা: প্রকৃতির এই সুন্দর রূপকে টিকিয়ে রাখতে চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল বা কোনো আবর্জনা যত্রতত্র ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না।
আদিবাসীদের প্রতি শ্রদ্ধা: স্থানীয় গারো ও হাজং সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে সম্মান করুন। তাদের ছবি তোলার আগে অবশ্যই বিনীতভাবে অনুমতি নিয়ে নেওয়া উচিত।
কক্সবাজার বা সাজেকের চেনা ভিড় আর কোলাহলে যখন ভ্রমণের আসল আনন্দটাই হারিয়ে যায়, তখন শেরপুরের ‘পানিহাতা তারানি’ হতে পারে আপনার মনের ক্লান্তি দূর করার এক পারফেক্ট রিফ্রেশমেন্ট জোন। পাহাড়, নদী, মেঘ আর আদিবাসী সংস্কৃতির এমন নিখুঁত মেলবন্ধন বাংলাদেশের খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। তাই আর দেরি না করে, আগামী ছুটির দিনেই ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন প্রকৃতির এই গোপন স্বর্গরাজ্যের উদ্দেশ্যে। যান্ত্রিক শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির একদম কাছাকাছি কাটানো এই কয়েকটি ঘণ্টা আপনার স্মৃতির পাতায় চিরকাল এক সোনালী অধ্যায় হয়ে থাকবে।