Home পরিবেশ শৈশবের পিঠে উপার্জনের বোঝা: বাংলাদেশে কেন কমছে না শিশুশ্রম? বর্তমান পরিসংখ্যান, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও এক সামাজিক উদাসীনতার বিশদ অন্তর্দৃষ্টি

শৈশবের পিঠে উপার্জনের বোঝা: বাংলাদেশে কেন কমছে না শিশুশ্রম? বর্তমান পরিসংখ্যান, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও এক সামাজিক উদাসীনতার বিশদ অন্তর্দৃষ্টি

0
শৈশবের পিঠে উপার্জনের বোঝা: বাংলাদেশে কেন কমছে না শিশুশ্রম? বর্তমান পরিসংখ্যান, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও এক সামাজিক উদাসীনতার বিশদ অন্তর্দৃষ্টি
খাতার বদলে হাতে উপার্জনের বোঝা! দারিদ্র্য ও সামাজিক উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে শিশুদের সস্তা শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করছে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী।

নিউজ ডেক্স: পাবনা নিউজ ২৪

০১ জুলাই, ২০২৬

একটি দেশের ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকে তার শিশুদের চোখের আলোয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেই আলোর একটি বড় অংশই আজ ধুলোবালি, লেদ মেশিনের গ্রিজ আর ইটের ভাটার কালো ধোঁয়ায় মলিন হয়ে যাচ্ছে। দেশের মেগা প্রকল্প ও জিডিপি বৃদ্ধির চোখধাঁধানো গল্পের আড়ালে এক নিষ্ঠুর ও করুণ বাস্তবতা হলো ‘শিশুশ্রম’। বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদে সই করা এবং সরকারি নানা আশ্বাসের পরও দেশের লক্ষ লক্ষ শিশু তাদের বই-খাতা ফেলে নামছে জীবনযুদ্ধের নির্মম লড়াইয়ে। কেন আমাদের দেশে শিশুশ্রমের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি দিনের পর দিন টিকে আছে? সরকার এটি বন্ধ করতে কী কী উদ্যোগ নিয়েছে, কোথায় আমাদের সীমাবদ্ধতা এবং কেন সমাজ ও সাধারণ মানুষ এই বিষয়ে আজও সচেতন হচ্ছে না—তা নিয়ে পাবনা নিউজ ২৪-এর আজকের এই বিশেষ অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।

বাংলাদেশে বর্তমানে কত লক্ষ শিশুশ্রমিক রয়েছে? (ভয়াবহ পরিসংখ্যান)

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) সর্বশেষ যৌথ জরিপ ও পরিসংখ্যানের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৮ লক্ষ শিশু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ধরণের শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে।এর চেয়েও শঙ্কার বিষয় হলো, এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১২ লক্ষ শিশু এমন সব কাজে যুক্ত, যেগুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম’ (Hazardous Child Labour) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন— মোটর গ্যারেজ, ওয়েল্ডিং কারখানা, লেদ মেশিন, অ্যালুমিনিয়াম কারখানা, ট্যানারি শিল্প এবং ইটভাটায় কাজ করা। এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী এবং নিরাময় অযোগ্য ক্ষতিসাধন করছে।

কেন এই পরিস্থিতি? শিশুশ্রম টিকে থাকার মূল কারণসমূহ

বাংলাদেশ থেকে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়ার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট এবং গভীর আর্থ-সামাজিক কারণ দায়ী:

চরম দারিদ্র্য ও পারিবারিক সংকট: আমাদের দেশে গ্রামীণ ও শহরের বস্তি অঞ্চলের বহু পরিবার এখনও চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হলে বা মারা গেলে, বেঁচে থাকার তাগিদে অবুঝ শিশুদের আয়ের পথ খুঁজতে হয়।

সস্তা শ্রমের জোগান (Cheap Labour): অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ও কলকারখানার মালিক প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের কাজে নিতে বেশি পছন্দ করেন। কারণ, শিশুদের দিয়ে অনেক বেশি সময় খাটিয়ে নেওয়া যায় কিন্তু মজুরি দিতে হয় প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে অর্ধেক বা তারও কম। তাছাড়া, শিশুরা নিজেদের অধিকার নিয়ে প্রতিবাদ বা আন্দোলন করতে পারে না।

জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীভাঙন: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতি বছর দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। এসব পরিবার যখন ভিটেমাটি হারিয়ে শহরে এসে বস্তিতে আশ্রয় নেয়, তখন বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের ছোট ছোট সন্তানদের কাজে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং কেন তা ব্যর্থ হচ্ছে?

বাংলাদেশ সরকার শিশুশ্রম নিরসনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং দেশীয়ভাবে বিভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরি করেছে:

আইনি পদক্ষেপ ও লক্ষ্যমাত্রা: সরকার ২০২৫-২০২৬ সালের মধ্যে দেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরণের শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নির্মূল করার একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে কাজে রাখা সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মূল ধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করা, বিনামূল্যে বই বিতরণ এবং উপবৃত্তি কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি এই আইন ও পদক্ষেপগুলো মূলত কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনের অভাব, কলকারখানাগুলোতে নিয়মিত আইনি অভিযান না হওয়া এবং দুর্নীতিবাজ মালিকদের নামমাত্র জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়ার ফলেই আইনের কোনো বাস্তব প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিনিয়ত শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছে।

কেউ সচেতন হচ্ছে না কেন? এর পেছনে কারা দায়ী?

শিশুশ্রমের এই ভয়াবহতা দিন দিন বাড়লেও আমাদের সমাজ ও সাধারণ মানুষের মাঝে এক চরম উদাসীনতা লক্ষ করা যায়। কেউ এই বিষয়ে সচেতন হতে চাচ্ছেন না, যার পেছনে মূলত ৩টি পক্ষ বা কারণ দায়ী:

ক. নিয়োগকর্তা বা মালিকপক্ষ: যে সব ব্যবসায়ী বা গৃহস্থরা শিশুদের কাজে রাখছেন, তারা সম্পূর্ণ সচেতনভাবেই আইন লঙ্ঘন করছেন। তারা নিজেদের অতিরিক্ত মুনাফা এবং সস্তা শ্রমের লোভ সামলাতে পারছেন না। অনেক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে শিশু গৃহকর্মীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হলেও সেটিকে সাধারণ ঘটনা হিসেবে ধামাচাপা দেওয়া হয়।

খ. সচেতন নাগরিক সমাজ ও মধ্যবিত্তের মানসিকতা: আমরা রাস্তায়, হোটেলে কিংবা চায়ের দোকানে ছোট শিশুদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছি, কিন্তু কেউ এর প্রতিবাদ করছি না বা তাদের স্কুলগামী করার উদ্যোগ নিচ্ছি না। শিশুশ্রমকে সমাজের একটি ‘স্বাভাবিক অংশ’ হিসেবে মেনে নেওয়ার এই বিকৃত মানসিকতাই এর জন্য বড় দায়ী।

গ. তদারকি সংস্থার চরম গাফিলতি: সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের যে সব কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে কাজ তদারকি করার কথা, তাদের চরম গাফিলতি ও জবাবদিহিতার অভাব এই পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী।

আইন করে বা শুধু দিবস পালন করে লক্ষ লক্ষ শিশুর কাঁধ থেকে এই ভারী উপার্জনের বোঝা নামানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক জাগরণ। শিশুদের জন্য শুধুমাত্র উপবৃত্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দিচ্ছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর জেলের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজ যে শিশুটি ইটভাটায় ইট ভাঙছে বা গ্যারেজে কাজ করছে, সে কেবল নিজের শৈশব হারাচ্ছে না, বরং একটি রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সামগ্রিক ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here