নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে আবারও এক মর্মান্তিক ও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস লিকেজ হয়ে অন্তত ৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন শ্রমিক গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পাঁচ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে অসংখ্য শিল্প দুর্ঘটনার রিপোর্ট করেছি, কিন্তু সীতাকুণ্ডের এই ঘটনাটি আবারও শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শ্রমিকের জীবনের সুরক্ষার প্রশ্নটিকে তীব্রভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপট: যা ঘটেছিল ওই মুহূর্তে
প্রাথমিক তথ্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আজ সকালে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে কর্মব্যস্ততা চলাকালীন শ্রমিকরা একটি পুরোনো জাহাজের ভেতরে কাজ করছিলেন। জাহাজটি কাটার প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে হঠাৎ করেই ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের লিকেজ শুরু হয়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই গ্যাসের তীব্রতায় এবং অক্সিজেনের অভাবে সেখানে থাকা শ্রমিকরা অজ্ঞান হয়ে পড়েন।ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সহকর্মীদের ভাষ্যমতে, বিস্ফোরণ বা আগুনের চেয়েও গ্যাসের প্রকোপ ছিল অত্যন্ত মারাত্মক। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা উদ্ধার অভিযানে নামলেও বদ্ধ জায়গার ভেতর গ্যাস জমে থাকায় উদ্ধারকারীদের জন্যও পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছিল। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় শ্রমিকদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা ৮ জনকে মৃত ঘোষণা করেন।
কেন বারবার ঘটছে সীতাকুণ্ডে দুর্ঘটনা?
সীতাকুণ্ডকে বলা হয় দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু গত এক দশকে এই শিল্পে ঘটে যাওয়া একের পর এক দুর্ঘটনা প্রমাণ করে যে, এখানে আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড (International Labour Standards) মেনে চলা হচ্ছে না। আমাদের নিউজ ডেস্কের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বেশ কিছু গাফিলতির দিক:
অনিরাপদ কর্মপরিবেশ: পুরোনো জাহাজগুলো কাটার আগে সেগুলোতে জমে থাকা গ্যাস, তেল বা রাসায়নিক পদার্থ পুরোপুরি নিষ্কাশন না করেই শ্রমিকদের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। এটি একটি চরম অবহেলা।
প্রশিক্ষণের অভাব: বেশিরভাগ শ্রমিক কোনো ধরনের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ছাড়াই এই বিপজ্জনক কাজ করেন। কীভাবে গ্যাস শনাক্ত করতে হয় বা জরুরি অবস্থায় কীভাবে বের হতে হয়, সে বিষয়ে তাদের ন্যূনতম ধারণা থাকে না।
সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব: শ্রমিকদের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই মালিকপক্ষ তা নিশ্চিত করে না।
মনিটরিংয়ের শিথিলতা: পরিবেশ অধিদপ্তর ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের নিয়মিত তদারকির অভাব এবং লাইসেন্স নবায়নের সময় কঠোর যাচাই-বাছাই না করার কারণে ইয়ার্ড মালিকরা নিয়ম ভাঙার সাহস পাচ্ছেন।শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে যখন ৮টি প্রাণ ঝরে যায়, তখন কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বলে একে দায় এড়ানো সম্ভব নয়। দীর্ঘ ৫ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, কিন্তু সেই তদন্তের সুপারিশ আলোর মুখ দেখে না।
ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের দায়ভার নিরূপণে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন। যদি মালিকপক্ষের অবহেলা বা নিয়ম ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা কেবল মালিকপক্ষের দায় নয়, সরকারকেও এক্ষেত্রে তদারককারী হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে।সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আধুনিকায়ন অনিবার্য।
গ্রিন শিপ ব্রেকিং: আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙার পদ্ধতি অনুসরণের জন্য ইয়ার্ডগুলোকে বাধ্য করতে হবে।
শ্রমিক ডাটাবেজ: প্রতিটি শ্রমিকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রশিক্ষণের রেকর্ড সংরক্ষণের জন্য একটি সেন্ট্রাল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।
নিরাপত্তা অডিট: প্রতি তিন মাস অন্তর প্রতিটি ইয়ার্ডে কঠোর নিরাপত্তা অডিট পরিচালনা করতে হবে এবং অকৃতকার্য ইয়ার্ডের লাইসেন্স স্থগিত করতে হবে।
দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা: শিল্পাঞ্চলের নিকটেই বিশেষায়িত বার্ন ও ট্রমা সেন্টার স্থাপন করতে হবে যাতে দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।
সীতাকুণ্ডের আকাশে আজ শোকের কালো মেঘ। ৮টি শ্রমিকের মৃত্যুর মানে হলো ৮টি পরিবারের স্বপ্ন চুরমার হয়ে যাওয়া। এই মৃত্যুগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, এগুলো আমাদের শিল্প ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। সরকার এবার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে দেখবে এবং আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়, তা নিশ্চিত করবে।নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করে শিল্পায়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। আমরা এই ঘটনার শেষ পর্যন্ত নজর রাখব এবং প্রকৃত দোষীদের বিচারের মুখোমুখি না করা পর্যন্ত আমাদের অনুসন্ধানমূলক রিপোর্ট অব্যাহত থাকবে।