Home লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য হাম ও ডেঙ্গুর দ্বিমুখী থাবা: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ জনের মৃত্যু, মোট প্রাণহানি বেড়ে ৮৬৩

হাম ও ডেঙ্গুর দ্বিমুখী থাবা: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ জনের মৃত্যু, মোট প্রাণহানি বেড়ে ৮৬৩

0
হাম ও ডেঙ্গুর দ্বিমুখী থাবা: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ জনের মৃত্যু, মোট প্রাণহানি বেড়ে ৮৬৩
এই ছবিটি একটি এডিস মশার ক্লোজ-আপ দৃশ্য, যা ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করতে সক্ষম। সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য বুলেটিন অনুযায়ী, দেশে হাম ও এর সদৃশ উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, মোট মৃত্যু বেড়ে ৮৬৩ হয়েছে। এই পরিস্থিতি প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।

নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪

বাংলাদেশ বর্তমানে এক জটিল ও বহুমুখী ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে সময় অতিক্রম করছে। ঋতুচক্রের পালাবদল এবং আগস্ট মাসের এই ভ্যাপসা গরম, অসহনীয় আর্দ্রতা এবং এর সাথে পাল্লা দিয়ে চলা থেমে থেমে বর্ষণের ফলে দেশের সামগ্রিক আবহাওয়া পরিবেশ এক ভিন্ন ও চরম রূপ নিয়েছে। এই অনুকূল আবহাওয়া পরিবেশে একদিকে যেমন জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বিভিন্ন জটিল ও সংক্রামক রোগবালাই। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে হাম এবং এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রকোপ যেভাবে বাড়ছে, তা জাতীয় স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় ধরনের অ্যালার্ম বা সতর্কবার্তা হয়ে দেখা দিয়েছে। পাঁচ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য-উপাত্তের আলোকে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে দেশের আবহাওয়া, স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং এর প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি ও পরিবেশগত প্রভাব

আগস্ট মাসের এই সময়ে এসে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে তাপমাত্রা মাঝারি পর্যায়ে থাকলেও অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ভ্যাপসা গরম ও অস্বস্তি চরম আকার ধারণ করেছে। থেমে থেমে বৃষ্টিপাত এবং ড্রেন-নর্দমা বা বিভিন্ন নিচু জায়গায় জমে থাকা পানি এই আবহাওয়াকে আরও জটিল ও অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে।

পরিবেশগত ঝুঁকি: থেমে থেমে বৃষ্টির এই চক্র বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষতিকর জীবাণুর বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে।

মশার উপদ্রব: বৃষ্টির পানি জমে থাকার কারণে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা ডেঙ্গু সংক্রমণের গ্রাফকে দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী করতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি: হাম ও ডেঙ্গুর দ্বিমুখী আক্রমণ

দেশের বর্তমান স্বাস্থ্যখাতে যে দুটি রোগ সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ও বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, তা হলো হাম এবং ডেঙ্গু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক বুলেটিন ও মাঠের চিত্র বলছে বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

হামের ভয়াবহ রূপ: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ ও সংক্রামক প্রভাবে নতুন করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই হামের প্রকোপে বিভিন্ন বয়সের মানুষ আক্রান্ত হলেও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কোমলমতি শিশুরা। দেশজুড়ে হাম ও এর সদৃশ উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৮৬ চিকিৎসকদের মতে, সঠিক সময়ে টিকা না নেওয়া এবং সচেতনতার অভাবেই এই ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী বিস্তার: বর্ষার এই মৌসুমে ডেঙ্গুর আক্রমণ নতুন রূপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য বিবৃতির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন ডেঙ্গু রোগীর ভর্তি অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন বহু মূল্যবান প্রাণ। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগে ডেঙ্গুর বিস্তার মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

রোগ বিস্তারের নেপথ্য কারণসমূহ

কেন বারবার এই ধরনের মৌসুমী ও সংক্রামক রোগগুলো মহামারী রূপ নিচ্ছে, তার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা:

সচেতনতার ঘাটতি: প্রান্তিক পর্যায়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে হাম বা ডেঙ্গু নিয়ে প্রাথমিক সচেতনতার মারাত্মক অভাব রয়েছে। সাধারণ জ্বর বা শরীরে র‌্যাশ ওঠার বিষয়গুলোকে সাধারণ বলে অবহেলা করার প্রবণতা বড় বিপদ ডেকে আনে।

পর্যাপ্ত মশা নিধন কার্যক্রমের অভাব: স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশনগুলোর পক্ষ থেকে জোরালো চিরুনি অভিযান বা লার্ভিসাইড প্রয়োগে অনিয়মিত হওয়া এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন: অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্দ্র আবহাওয়া রোগজীবাণুর জীবনচক্রকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করছে।

করণীয় ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক উভয় স্তর থেকেই সুনির্দিষ্ট প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে:

হাম প্রতিরোধের উপায়:

যে সব শিশুর বয়স ৬ থেকে ৫৯ মাসের মধ্যে, তাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত হাম-রুবেলার অতিরিক্ত বা নির্ধারিত ডোজের টিকা নিশ্চিত করতে হবে।

আক্রান্ত শিশুকে আলাদা বা আইসোলেশনে রাখতে হবে যাতে অন্য শিশুদের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়াতে না পারে।

পুষ্টিকর খাবার ও প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার খাওয়াতে হবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও মশা দমন:

বাড়িঘরের আশপাশ সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে। টব, ডাবের খোসা, ফ্রিজ বা এসি রিমুভের নিচে জমে থাকা পানি নিয়মিত ফেলে দিতে হবে।

দিন কিংবা রাত—যেকোনো সময়ই ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে কয়েল বা রিপেলেন্ট ক্রিম ব্যবহার করতে হবে।

স্বাস্থ্য বিভাগের সতর্কতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যে দেশজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ও হামের চিকিৎসায় আলাদা কর্নার বা ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ মহামারী বা বড় ধরনের স্বাস্থ্য বিপর্যয় এড়াতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সমন্বিত মশা নিধন ব্যবস্থাপনা (IWM), বছরব্যাপী সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করার বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে; সামান্য উপসর্গ দেখা দিলে সাথে সাথে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তবেই একটি সুস্থ, সবল ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here