Home লাইফস্টাইল হুনজা উপত্যকার শতবর্ষী রহস্য: হুনজা জাতির দীর্ঘায়ু, রোগমুক্ত জীবন ও আধুনিক সভ্যতার জন্য এক চরম চাবুক

হুনজা উপত্যকার শতবর্ষী রহস্য: হুনজা জাতির দীর্ঘায়ু, রোগমুক্ত জীবন ও আধুনিক সভ্যতার জন্য এক চরম চাবুক

0
হুনজা উপত্যকার শতবর্ষী রহস্য: হুনজা জাতির দীর্ঘায়ু, রোগমুক্ত জীবন ও আধুনিক সভ্যতার জন্য এক চরম চাবুক
প্রকৃতির সাথে পরম মিতালী, কঠোর শারীরিক পরিশ্রম এবং প্রক্রিয়াজাতহীন সম্পূর্ণ অর্গানিক খাদ্যাভ্যাসই হুনজা উপত্যকার মানুষদের ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চিরসবুজ ও রোগমুক্ত রাখে।

নিউজ ডেস্ক | পাবনা নিউজ ২৪

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির এই যুগে মানুষের গড় আয়ু যখন ৭০ থেকে ৭৫ বছরের মধ্যে ওঠানামা করছে, এবং ডায়াবেটিস, ক্যানসার, হার্ট অ্যাটাকের মতো ব্যাধিগুলো যখন ৩০-৪০ বছর বয়সীদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই পৃথিবীর মানচিত্রে এক জীবন্ত বিস্ময় হিসেবে টিকে আছে ‘হুনজা’ (Hunza) জাতি।পাকিস্তানের উত্তর প্রান্তে, গিলগিট-বালতিস্তানের দুর্গম এবং নয়নাবিরাম এক পর্বত ঘেরা উপত্যকায় এই অনন্য জনগোষ্ঠীর বাস। কারাকোরাম ও হিমালয়ের পর্বতশ্রেণীর মাঝে অবস্থিত এই উপত্যকার মানুষগুলোর গড় আয়ু শুনলে যেকোনো আধুনিক মানুষ চমকে উঠবেন। তারা অনায়াসে ১০০ থেকে ১২০ বছর পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকেন। এমনকি কোনো কোনো হুনজা নাগরিকের ১৪০ থেকে ১৫০ বছর বেঁচে থাকার নজিরও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের খাতায় নথিবদ্ধ আছে।হুনজাদের এই অবিশ্বাস্য জীবনযুদ্ধ, তাদের শরীরতত্ত্বের গভীর রহস্য, আধুনিক মানুষের সাথে তাদের ব্যবধান এবং তাদের প্রতিটি দৈনন্দিন অভ্যাসের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ নিয়ে তৈরি এই বিশেষ প্রতিবেদন।

হুনজা কারা? তাদের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়

হুনজা উপত্যকাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮,২০০ ফুট (২,৫০০ মিটার) উঁচুতে অবস্থিত। চারদিকে বরফাবৃত উঁচু পাহাড় এবং মাঝে বয়ে চলা নদী—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলটি পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে প্রাকৃতিকভাবেই বিচ্ছিন্ন।

ঐতিহাসিক একটি লোককথা প্রচলিত আছে যে, হুনজা জাতি আসলে মহান গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের (Alexander the Great) সৈন্যদের বংশধর। ধারণা করা হয়, আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সময় কিছু সৈন্য অসুস্থ বা আহত হয়ে এই দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকায় আশ্রয় নেন এবং পরবর্তীতে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাদের ইউরোপীয় অবয়ব, ফর্সা ত্বক ও উজ্জ্বল নীল বা সবুজ চোখ আজও এই দাবির পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। তবে তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের চেয়েও বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে তাদের অবিশ্বাস্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দীর্ঘায়ু।

হুনজা সমাজের শরীরতাত্ত্বিক অলৌকিকতা: বিজ্ঞান যেখানে থমকে দাঁড়ায়

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, হুনজারা পৃথিবীর অন্যতম সুস্থ ও প্রাণবন্ত জনগোষ্ঠী। তাদের সমাজকে বিশ্লেষণ করলে কিছু অলৌকিক স্বাস্থ্যগত সত্য সামনে আসে:

শতবর্ষী চিরযৌবন

আমরা যেখানে ৫০ বছর পেরোতেই বার্ধক্যের নানাবিধ উপসর্গে ভুগতে শুরু করি, সেখানে একজন ৭০ বা ৮০ বছরের হুনজা পুরুষ বা নারীকে দেখলে মনে হবে তারা তাদের জীবনের সোনালী যৌবনে আছেন। ৮০ বছর বয়সী হুনজা নারীদের ত্বকে কোনো বলিরেখা বা বয়সের ছাপ থাকে না, চুল সহজে পাকে না। সবচেয়ে বড় চমক হলো, হুনজা পুরুষরা ৯০ থেকে ১০০ বছর বয়সেও অনায়াসে বাবা হওয়ার শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখেন এবং নারীরা ৬০-৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব করতে পারেন।

ক্যানসার এবং ওবেসিটির অনুপস্থিতি

গত কয়েক দশকে হুনজা উপত্যকায় যাওয়া আন্তর্জাতিক মেডিকেল টিমগুলো পরীক্ষা করে দেখেছে, এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো একক ব্যক্তির শরীরেও ক্যানসার কোষের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এটি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য এক বিরাট গবেষণার বিষয়। এছাড়া তাদের পুরো সমাজে কোনো স্থূল বা অতিরিক্ত ওজনের (Obese) মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রত্যেকেই অত্যন্ত লিন (Lean) এবং মাসকুলার বা পেশীবহুল শারীরিক গঠনের অধিকারী।

হুনজাদের ইউনিক লাইফস্টাইলের আদ্যোপান্ত: কেন তারা এতো শক্তিশালী?

হুনজাদের এই দীর্ঘায়ু কোনো জাদুমন্ত্র বা জিনগত অলৌকিকতা নয়, বরং তাদের অতি সাধারণ কিন্তু কঠোর কিছু জীবনযাত্রার ফল। তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রধান স্তম্ভগুলো নিচে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো:

অ্যাপ্রিকট বা খুবানির সাম্রাজ্য

হুনজাদের খাদ্যতালিকার প্রধান চালিকাশক্তি হলো অ্যাপ্রিকট বা খুবানি ফল। তাদের উপত্যকায় বিপুল পরিমাণে এই ফল চাষ হয়। গ্রীষ্মকালে তারা গাছ থেকে পেড়ে তাজা অ্যাপ্রিকট খায়, আর শীতের জন্য বাকি ফল রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করে।

বি-১৭ এর জাদু: হুনজারা অ্যাপ্রিকট ফলের চেয়েও এর ভেতরের শক্ত বীজটিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা এই বীজ ভেঙে ভেতরের অংশটি (Kernel) নিয়মিত খায় এবং এটি থেকে তেল নিষ্কাশন করে রান্নার কাজে ব্যবহার করে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই এপ্রিকট বীজে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি-১৭ (Amygdalin) থাকে। এই উপাদানটি প্রাকৃতিকভাবে শরীরের ক্যানসার কোষকে ধ্বংস করতে অত্যন্ত কার্যকরী, যা হুনজাদের ক্যানসারমুক্ত রাখার প্রধান কারণ।

 হিমবাহের খনিজ জল (Glacial Milk)

হুনজা উপত্যকার মানুষ যে পানি পান করে, তা সরাসরি কারাকোরাম পর্বতের হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার গলে নেমে আসে। এই পানি দেখতে কিছুটা ঘোলাটে বা ধূসর রঙের হয়, তাই স্থানীয়ভাবে একে ‘গ্লেসিয়ার মিল্ক’ বা হিমবাহের দুধ বলা হয়।

এই পানিতে উচ্চমাত্রায় প্রাকৃতিক কোয়ার্টজ, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং আয়রনের মতো অতিপ্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান কলোইডাল ফর্মে (Colloidal form) দ্রবীভূত থাকে। এই পানি নিয়মিত পানের ফলে তাদের হজমশক্তি অত্যন্ত তীব্র হয় এবং হাড়ের ক্ষয়রোগ বা আর্থ্রাইটিস কখনোই তাদের স্পর্শ করতে পারে না।

বাধ্যতামূলক ‘বসন্তকালীন উপবাস’ (Spring Fasting)

হুনজাদের লাইফস্টাইলের অন্যতম ইউনিক দিক হলো তাদের প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া উপবাসের অভ্যাস। প্রতি বছর শীতের শেষে এবং বসন্তের শুরুতে (যখন নতুন ফসল মাত্র বোনা হয় কিন্তু আগের মজুত খাবার ফুরিয়ে আসে), তখন উপত্যকায় প্রায় ২ থেকে ৩ মাসের জন্য খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দেয়।

এই সময়টাকে হুনজারা একটি পবিত্র নিয়ম হিসেবে মেনে নেয়। তারা কোনো শক্ত খাবার বা শস্য দানা না খেয়ে, কেবল শুকনো অ্যাপ্রিকটের তৈরি জুস খেয়ে মাসের পর মাস কাটিয়ে দেয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান একে ‘অটোফেজি’ (Autophagy) বলে, যার জন্য ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। এই দীর্ঘ উপবাসের ফলে শরীরের সমস্ত বিষাক্ত টক্সিন, মরা কোষ এবং ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া প্রাকৃতিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায় এবং শরীর সম্পূর্ণ পুনরুজ্জীবিত হয়।

যান্ত্রিকতাহীন দৈনন্দিন পরিশ্রম

হুনজা উপত্যকায় কোনো আধুনিক যানবাহন বা যান্ত্রিক সুবিধা নেই বললেই চলে। খাড়া পাহাড়ের গায়ে তৈরি করা ফসলের ক্ষেতে কাজ করতে তাদের প্রতিদিন মাইলের পর মাইল চড়াই-উতরাই পার হতে হয়। একজন ৮০ বছরের হুনজা বৃদ্ধ প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে পাড়ি দেন। তাদের এই কঠোর শারীরিক সক্রিয়তার কারণে হৃদযন্ত্র এবং ফুসফুস আজীবন শতভাগ সচল থাকে।

মানসিক প্রশান্তি ও উৎসবমুখর জীবন

হুনজারা অত্যন্ত সহজ-সরল এবং অতিথিপরায়ণ। তাদের সমাজে আধুনিক যুগের মতো কর্পোরেট ইঁদুর দৌড়, ডিপ্রেশন, ট্রাফিক জ্যাম বা আর্থিক অনটনের তীব্র মানসিক চাপ নেই। তারা যা উৎপাদন করে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকে। নিয়মিত গান, নাচ এবং সামাজিক উৎসবের মাধ্যমে তারা সবসময় হাসিখুশি থাকে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, তাদের এই কর্টিসল (Cortisol) বা স্ট্রেস হরমোনমুক্ত জীবনই তাদের কোষে বার্ধক্য আসতে দেয় না।

আমরা কেন পারছি না? আধুনিক মানুষের পতনের মূল কারণসমূহ

হুনজাদের এই আদিম ও সফল জীবনযাত্রার বিপরীতে আমাদের আধুনিক নাগরিক জীবনকে দাঁড় করালে বোঝা যায় কেন আমরা মাত্র ৪০-৫০ বছর বয়সেই জরাগ্রস্ত হয়ে পড়ছি:

আল্ট্রা-প্রসেসড খাবারের আগ্রাসন: আমরা প্রতিদিন যে প্যাকেটজাত খাবার, চিপস, কোল্ড ড্রিংকস, প্রিজারভেটিভযুক্ত সস, এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার খাচ্ছি, তা আমাদের লিভার এবং অন্ত্রকে প্রতিনিয়ত ধ্বংস করছে। প্লাস্টিকের ব্যবহার এবং খাবারে ভেজালের কারণে আমাদের শরীর এখন রোগের ডিপো।

সেডেন্টারি বা অলস জীবনযাত্রা: আমাদের সকাল শুরু হয় ডেস্কে বসে, আর রাত শেষ হয় বিছানায় মোবাইল স্ক্রিনের সামনে। শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং সারাদিন এসির নিচে বসে থাকার ফলে শরীরের রক্তসঞ্চালন ব্যাহত হচ্ছে এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে, যা ডায়াবেটিসের মূল কারণ।

ক্রনিক স্ট্রেস ও অনিদ্রা: রাত জেগে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোলিং, ক্যারিয়ারের তীব্র মানসিক চাপ এবং অপরিমিত ঘুমের কারণে আমাদের শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণে রিপ্রোডাক্টিভ ও গ্রোথ হরমোন তৈরি করতে পারছে না। ফলে অল্প বয়সেই চুল পেকে যাওয়া, ত্বক ঝুলে যাওয়া এবং ক্লান্তি আমাদের গ্রাস করছে।

হুনজাদের থেকে আমাদের যা শেখা উচিত এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয়

আধুনিক ব্যস্ত শহরের বুকে বসে পুরোপুরি হুনজাদের মতো পাহাড়ি জীবনযাপন করা অসম্ভব। তবে তাদের মূল জীবনদর্শনকে আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি:

খাদ্যে বদল আনুন: প্রতিদিনের খাবার থেকে রিফাইন্ড চিনি, ময়দা এবং সয়াবিন তেলের ব্যবহার কমিয়ে দিন। এর বদলে খাঁটি সরিষার তেল বা ঘি, দেশি ফলমূল, শাকসবজি এবং কাঠবাদাম বা কাজুবাদামের মতো প্রাকৃতিক খাবার যুক্ত করুন।

হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন: প্রতিদিন অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার কদম হাঁটার লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। একটানা ১ ঘণ্টার বেশি বসে কাজ করবেন না, মাঝে মাঝে উঠে দাঁড়ান এবং শরীরকে স্ট্রেচ করুন।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করুন: সপ্তাহে অন্তত একদিন বা দুদিন ১৬ ঘণ্টা উপবাস বা ফাস্টিংয়ের অভ্যাস করুন (অথবা ধর্মীয় রোজা রাখুন)। এটি আপনার শরীরের মেটাবলিজম বা পরিপাক প্রক্রিয়াকে একদম বদলে দেবে।

ডিটক্স ওয়াটার ও পর্যাপ্ত জল: দিনে অন্তত ৩-৪ লিটার বিশুদ্ধ পানি পান করুন। সম্ভব হলে পানিতে লেবু, শশা বা পুদিনা পাতা দিয়ে ডিটক্স ওয়াটার বানিয়ে খেতে পারেন, যা হুনজাদের খনিজ পানির মতো শরীর পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করবে।

হুনজা জাতির দীর্ঘায়ু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের শরীর কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক বা ওষুধের ওপর ভিত্তি করে চলার জন্য তৈরি হয়নি। প্রকৃতি আমাদের যেভাবে তৈরি করেছে, আমরা যত বেশি প্রকৃতির কাছাকাছি থাকব, আমাদের শরীর তত বেশি সুস্থ ও দীর্ঘস্থায়ী হবে। হুনজা উপত্যকার এই শতাব্দী প্রাচীন শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে ধারণ করে আমরাও পারি একটি রোগমুক্ত, সুন্দর ও দীর্ঘ জীবনের অধিকারী হতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here