Home লাইফস্টাইল সংস্কৃতি হেমায়েতপুরের শান্তির খোঁজে: শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ ও পাবনার আধ্যাত্মিক ধারা

হেমায়েতপুরের শান্তির খোঁজে: শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ ও পাবনার আধ্যাত্মিক ধারা

0
হেমায়েতপুরের শান্তির খোঁজে: শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ ও পাবনার আধ্যাত্মিক ধারা
পাবনার হেমায়েতপুরে অবস্থিত যুগপুরুষ শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের স্মৃতিবিজড়িত কেন্দ্রীয় সৎসঙ্গ আশ্রমের মূল মন্দির।

পাবনা শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার পশ্চিমে, ইছামতী নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি শান্ত, ছায়াসুনিবিড় জনপদ। শহরের পিচঢালা পথ ছেড়ে যখনই আপনি এই চত্বরে পা রাখবেন, এক অদ্ভুত নীরবতা আর স্নিগ্ধতা আপনাকে গ্রাস করবে। বাতাসে ভেসে আসা ধূপের গন্ধ, দূর থেকে ভেসে আসা মৃদু প্রার্থনা আর চারপাশের সবুজ গাছপালা মুহূর্তের মধ্যেই মনের সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে দেবে।

এই স্থানটিই হলো আধ্যাত্মিক সাধক শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ‘সৎসঙ্গ’ আশ্রম।

যাঁরা ভাবেন পাবনা মানেই শুধু কলকারখানা, মানসিক হাসপাতাল কিংবা রূপপুরের পারমাণবিক প্রকল্প, তাঁদের জন্য পাবনার আরেক অনন্য পরিচয় লুকিয়ে আছে এই হেমায়েতপুরের মাটিতে। ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানবকল্যাণের যে বীজ আজ থেকে এক শতাব্দী আগে এই পাবনায় রোপণ করা হয়েছিল, আজ ‘পাবনা নিউজ ২৪’-এর বিশেষ ইন-ডেপ্থ ফিচারে আমরা চোখ রাখবো সেই আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অন্দরমহলে।

“জানতে হয় জগতটাকে, চলতে হয় সমাজ নিয়ে,

ভগবানকে পেতে হলে, মানুষ হ রে মানুষ দিয়ে।”

— শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

কে ছিলেন এই যুগপুরুষ অনুকূলচন্দ্র?

১৮৮৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পাবনার হেমায়েতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অনুকূলচন্দ্র দাশগুপ্ত। পিতা শিবচন্দ্র দাশগুপ্ত এবং মাতা মনোমোহিনী দেবীর এই সন্তান ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সাধারণের মাঝে অসাধারণ। পরবর্তীতে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনা (হোমিওপ্যাথি) শেষ করে নিজের গ্রাম হেমায়েতপুরেই প্র্যাকটিস শুরু করেন।

কিন্তু মানুষের শুধু শারীরিক চিকিৎসাই নয়, মনের এবং আত্মার চিকিৎসা করাই যেন ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তিনি মানুষের ভেতরের পরম সত্ত্বাকে জাগিয়ে তোলার কাজ শুরু করেন। তাঁর এই জীবনদর্শন, অহিংসা এবং আধ্যাত্মিক বাণীতে মুগ্ধ হয়ে হাজার হাজার মানুষ তাঁর সান্নিধ্যে আসতে শুরু করে। আর এভাবেই পাবনার মাটিতে জন্ম নেয় ‘সৎসঙ্গ’ (Satsang) আন্দোলন।

তপোবনের আদলে গড়ে ওঠা হেমায়েতপুর আশ্রম

অনুকূলচন্দ্র কেবল একজন ধর্মগুরু ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক ও দূরদর্শী চিন্তাবিদ। হেমায়েতপুরের এই আশ্রমটিকে তিনি সাজিয়েছিলেন প্রাচীন ভারতের ‘তপোবন’-এর আদলে।

একসময় এই আশ্রমে শুধু প্রার্থনাই হতো না, বরং মানুষের কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল কুটির শিল্প, ছাপাখানা, গবেষণাগার, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র এবং বিশাল একটি দাতব্য চিকিৎসালয়। এমনকি শিক্ষার প্রসারের জন্য তিনি এখানে ‘তপোবন বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পাবনার এই প্রত্যন্ত গ্রামটিই তখন হয়ে উঠেছিল দেশ-বিদেশের পণ্ডিত, বিজ্ঞানী এবং সাধকদের মিলনমেলা। মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মতো মহান নেতারাও এই হেমায়েতপুরের আশ্রমে ছুটে এসেছিলেন ঠাকুরের দর্শন পেতে।

দেশভাগ এবং এক শূন্যতার ইতিহাস

১৯৪৬ সাল। দেশভাগের ঠিক এক বছর আগে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিক কারণে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র পাবনা ছেড়ে ভারতের ঝাড়খণ্ডের দেওঘরে চলে যান। সেখানেও তিনি নতুন করে সৎসঙ্গ আশ্রম গড়ে তোলেন। কিন্তু তাঁর মন পড়েছিল পাবনার এই হেমায়েতপুরেই।

দেশভাগের পর পাবনার এই বিশাল সম্পত্তি দীর্ঘদিন নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছে। তবে আশার কথা হলো, শত ঝোড়ো হাওয়ার মাঝেও এই আশ্রমের মূল ঐতিহ্য ও চেতনাকে হারিয়ে যেতে দেয়নি পাবনাবাসী। বর্তমানে প্রতি বছর ঠাকুরের জন্ম ও প্রয়াণ তিথিতে বাংলাদেশ ও ভারতের হাজার হাজার ভক্তের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে এই প্রাঙ্গণ।

সম্প্রীতির এক জীবন্ত ক্যানভাস

বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে পাবনার এই সৎসঙ্গ আশ্রমটি আমাদের সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা দেয়, তা হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এখানে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই আসেন না, বরং প্রতিদিন বহু মুসলিম, খ্রিষ্টান কিংবা অন্যান্য ধর্মের মানুষ এবং পর্যটকরা আসেন এর শান্ত পরিবেশ উপভোগ করতে এবং ঠাকুরের মানবতাবাদী দর্শন সম্পর্কে জানতে।

আশ্রমের ভেতরে সাদা রঙের মূল মন্দির, ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত ঘর আর বিশাল দিঘিটি এক অদ্ভুত নান্দনিকতার সৃষ্টি করেছে। পাবনার স্থানীয় মুসলিম সমাজও এই আশ্রমের পবিত্রতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় সবসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে, যা পাবনাবাসীর অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

শেষ কথা: পাবনার পর্যটন ও আধ্যাত্মিক ব্র্যান্ডিং

শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ আশ্রম কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি পাবনার একটি অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ও পর্যটন সম্পদ। প্রতি বছর এই আশ্রমকে কেন্দ্র করে যে বিপুল পরিমাণ দর্শনার্থীর আগমন ঘটে, তাকে যদি সঠিকভাবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আরও আধুনিকায়ন করা যায়, তবে তা পাবনার অর্থনীতি ও পর্যটন খাতে এক বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে।

ইছামতীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা হেমায়েতপুরের এই আশ্রম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের আসল পরিচয় তাঁর ধর্মে নয়, তাঁর কর্মে ও মানবতার কল্যাণে। পাবনার এই আধ্যাত্মিক গৌরব অক্ষুণ্ণ থাকুক চিরকাল—পাবনা নিউজ ২৪ পরিবারের এটাই প্রত্যাশা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here