ডেস্ক রিপোর্ট, পাবনা নিউজ ২৪:
জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব এখন আর কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, বরং এক নির্মম বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের মাঝামাঝিতে এসে বিশ্ব এক চরম ও বিপরীতমুখী আবহাওয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। আজ (২ জুলাই, ২০২৬) বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের রিপোর্টে এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। উত্তর গোলার্ধের একটি বড় অংশ—বিশেষ করে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা যখন রেকর্ডভাঙা তীব্র তাপদাহে (Heatwave) পুড়ছে, ঠিক তখনই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা বর্ষাকালীন ভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার (Flash Floods) কবলে পড়েছে। প্রকৃতির এই দুই চরম রূপ বিশ্বব্যাপী জনজীবন, কৃষি এবং অর্থনীতিকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
তীব্র তাপদাহে পুড়ছে ইউরোপ ও আমেরিকা: জারি রেড অ্যালার্ট
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের ‘সুপার এল নিনো’ (Super El Niño) প্রভাব এবং বায়ুমণ্ডলে তৈরি হওয়া শক্তিশালী ‘হিট ডোম’ বা তাপ বলয়ের কারণে ইউরোপের দেশগুলোতে তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত কয়েকদিন ধরে ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি এবং ইতালিতে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠানামা করছে। তীব্র গরমের কারণে ইউরোপজুড়ে ইতিমধ্যেই এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং লাখ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। ফ্রান্সের প্রায় ৫৮টি বিভাগে সর্বোচ্চ স্তরের ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে।
একই অবস্থা বিরাজ করছে উত্তর ও মধ্য আমেরিকাতেও। অতিরিক্ত গরমের কারণে বিদ্যুৎ গ্রিডগুলোর ওপর চাপ মারাত্মকভাবে বেড়েছে, যার ফলে অনেক এলাকায় লোডশেডিং দেখা দিচ্ছে। তাপদাহের পাশাপাশি তীব্র খরা দেখা দেওয়ায় বনাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানলের (Wildfire) ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বর্ষার তাণ্ডব: লাওস ও ভারতে বন্যা পরিস্থিতি জটিল
ইউরোপ যখন পানির জন্য হাহাকার করছে, এশিয়ার চিত্র তখন সম্পূর্ণ উল্টো। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু বা বর্ষাকালের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওসে (Lao PDR) গত দুদিন ধরে চলা মুষলধারে বৃষ্টির কারণে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধস শুরু হয়েছে। মেকং নদীর অববাহিকায় পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় হাজার হাজার ঘরবাড়ি এবং ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একই সাথে থাইল্যান্ডের আবহাওয়া অধিদপ্তরও দেশের পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে আগামী ৩ জুলাই পর্যন্ত অতি ভারী বৃষ্টির কারণে বন্যার লাল সতর্কবার্তা জারি করেছে।
এদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও মৌসুমী বায়ুর তাণ্ডব চলছে। অরুণাচল প্রদেশ, সিকিম এবং উত্তরবঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট হড়পা বান বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশের অন্তত ১২টি জেলায় সড়ক ও সেতু ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মুম্বাই এবং এর আশেপাশের উপশহরগুলোতে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার ফলে বাণিজ্যিক রাজধানীর নিচু এলাকাগুলো জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ও বন্যাঝুঁকি
বৈশ্বিক এই আবহাওয়া পরিবর্তনের ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশেও। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়ার পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের ওপর কড়া নজর রাখছেন বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞরা। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট এবং লবণাক্ততার আগ্রাসন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বর্ষার শুরুতে এই অতিরিক্ত জোয়ারের পানি উপকূলীয় বাঁধগুলোর জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, শিল্পবিপ্লবের আগের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ইতিমধ্যেই ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার হয়ে গেছে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার বন্ধ না করলে এবং আন্তর্জাতিক ‘ডেল্টা প্ল্যান’ বা জলবায়ু তহবিলগুলো দ্রুত কার্যকর না করলে এই ধরণের চরম আবহাওয়া প্রতি বছর আরও বেশি ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়ে ফিরে আসবে। বিশ্বজুড়ে একদিকে খরা ও অন্যদিকে বন্যার এই সহাবস্থান প্রমাণ করে যে, প্রকৃতি তার ভারসাম্য দ্রুত হারাচ্ছে, যা মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের এখনই জরুরি ভিত্তিতে একযোগে কাজ করতে হবে।