ধর্ম ও সমাজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪:
একটি আদর্শ, সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের প্রধান ভিত্তি হলো নৈতিকতা, শালীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। কিন্তু বর্তমান আধুনিকতা ও ডিজিটাল যুগের ছোঁয়ায় আমাদের সমাজে নৈতিকতার চরম অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিনোদনের নামে এক শ্রেণীর মানুষ অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও পরিকল্পিতভাবে সমাজে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। পবিত্র ইসলাম ধর্মে অশ্লীলতাকে কেবল একটি ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে দেখা হয়নি, বরং একে সামাজিক ব্যাধি ও আল্লাহর গজব ডেকে আনার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অশ্লীলতার প্রসারে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জগতেই রয়েছে চরম লাঞ্ছনা ও কঠিন শাস্তি।
পবিত্র কুরআনের হুঁশিয়ারি
সমাজে অশ্লীলতা, নগ্নতা কিংবা অপসংস্কৃতির বিস্তার ঘটানো কতটা মারাত্মক অপরাধ, তা মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সূরা আন-নূরের ১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
“যারা ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।”
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, যারা নিজে অশ্লীলতায় লিপ্ত হয় তাদের চেয়েও বড় অপরাধী তারা, যারা সমাজ, মিডিয়া বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষের মাঝে অশ্লীলতার বিস্তার ঘটায়।
দুনিয়াব্যাপী লাঞ্ছনা ও আজাব
অশ্লীলতা যখন কোনো সমাজে মহামারি আকার ধারণ করে, তখন সেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে নানাবিধ দুনিয়াবি শাস্তি ও লাঞ্ছনা নেমে আসে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, “যখনই কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্য অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়বে, তখনই তাদের মধ্যে এমন সব নতুন রোগ ও মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটবে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের আমলে কখনো ছিল না।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)।
আজকের আধুনিক সমাজে আমরা যদি লক্ষ্য করি, তবে দেখব জিনা, ব্যভিচার ও নগ্নতার প্রসারের ফলে পরিবার প্রথা ভেঙে যাচ্ছে, ডিভোর্সের হার বাড়ছে, পরকীয়া ও সামাজিক অপরাধ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এগুলো সবই দুনিয়াবি লাঞ্ছনা ও অশান্তির জীবন্ত উদাহরণ।
আখিরাতের কঠিন আজাব
দুনিয়ার সাময়িক লাঞ্ছনা তো কেবল শুরু, অশ্লীলতার বিস্তারকারীদের জন্য আখিরাতে বা পরকালে অপেক্ষা করছে অত্যন্ত ভয়াবহ ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর কাঠগড়ায় এদের দাঁড়াতে হবে এবং মানুষের চরিত্র নষ্ট করার অপরাধে তাদেরকে জাহান্নামের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করা হবে। যারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে একটি অশ্লীল ভিডিও, ছবি বা কনটেন্ট লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, সেই কনটেন্টটি যতজন মানুষ দেখবে, তার সমপরিমাণ গুনাহ (গুনাহে জারিয়া) ওই ব্যক্তির আমলনামায় যোগ হতে থাকবে—যা পরকালে তাকে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।
আমাদের করণীয় ও উত্তরণের উপায়
অশ্লীলতার এই আগ্রাসন ও লাঞ্ছনা থেকে আমাদের সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে:
- পারিবারিক সচেতনতা: সন্তানরা ইন্টারনেটে ও মোবাইলে কী দেখছে, কার সাথে মিশছে—সে বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
- ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা: পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে।
- ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঠিক ব্যবহার: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেকোনো অশ্লীল ছবি, নাটক, ওয়েব সিরিজ বা গান শেয়ার ও লাইক দেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে।
- সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ: সমাজে কোথাও অশ্লীলতার চর্চা দেখলে সাধ্য অনুযায়ী তার প্রতিবাদ করা এবং শালীন সংস্কৃতির প্রচার করা।
শেষ কথা
অশ্লীলতা কোনো প্রগতি বা আধুনিকতা নয়, বরং এটি মানব চরিত্রকে ধ্বংস করার একটি মরণব্যাধি। দুনিয়ার সাময়িক সস্তা জনপ্রিয়তা বা অর্থ উপার্জনের লোভে যারা অশ্লীলতার প্রসারে শামিল হচ্ছে, তারা নিজেদের অজান্তেই দুনিয়া ও আখিরাতের চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা কামাই করছে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে অশ্লীলতার পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হয়ে শালীন ও সুন্দর জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।