Home Uncategorized প্রবাসীদের রক্তে ঘামে অর্জিত রেমিট্যান্স ও বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা: কেন এই ভোগান্তি?

প্রবাসীদের রক্তে ঘামে অর্জিত রেমিট্যান্স ও বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা: কেন এই ভোগান্তি?

0
প্রবাসীদের রক্তে ঘামে অর্জিত রেমিট্যান্স ও বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা: কেন এই ভোগান্তি?
দেশের অর্থনীতি সচল রাখা প্রবাসীরা কি তবে নিজেদের দেশে এসেও নিরাপদ নন? বিমানবন্দরের হয়রানি যেন তাদের রক্ত-ঘামের উপার্জনের চেয়ে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিউজ ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো প্রবাসী শ্রমিকরা। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভিত্তি করেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী থাকে। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের বিমানবন্দরে অবতরণের পর থেকেই এই প্রবাসীরা নানা ধরনের হয়রানি, প্রতারণা এবং বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। স্বপ্নের দেশ থেকে ফেরার পথে বিমানবন্দরে এসে তারা যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন, তা কেবল হতাশাজনক নয়, বরং জাতীয় মর্যাদার পরিপন্থী।

প্রবাসীদের হয়রানি: বিমানবন্দরের তিক্ত বাস্তবতা

বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানির অভিযোগ অনেক পুরনো। মূলত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে প্রবাসীদের সাথে যে ধরনের আচরণ করা হয়, তা অমানবিক।

পণ্য ছিনতাই ও চুরি: অনেক প্রবাসী অভিযোগ করেন যে, বিদেশ থেকে কষ্টার্জিত আয়ের বিনিময়ে কেনা শখের ইলেকট্রনিক পণ্য, স্মার্টফোন, এমনকি কাপড়চোপড়ও বিমানবন্দরের কিছু অসাধু চক্রের যোগসাজশে খোয়া যাচ্ছে। লাগেজ ভাঙচুর করে দামি জিনিস সরিয়ে নেওয়া যেন এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

প্রতারণার ফাঁদ: টার্মিনালের ভেতরে এবং বাইরে থাকা কিছু দালাল চক্র প্রবাসীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সহজ-সরল প্রবাসীদের ভুল বুঝিয়ে বিভিন্ন ফি বা ট্যাক্সের নামে টাকা আদায় করা হচ্ছে।

অসদাচরণ: ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস ডেস্কে নিয়োজিত কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্ব্যবহার প্রবাসীদের চরম মানসিক যন্ত্রণায় ফেলে। সঠিক নিয়মে মালামাল আনলেও অনেক সময় হয়রানির শিকার হতে হয়, যা একজন প্রবাসীকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়।

কারা এই সিন্ডিকেটের পেছনে?

প্রবাসীদের হয়রানির পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করে বলে ধারণা করা হয়। এর সাথে বিমানবন্দরের ভেতরে কর্মরত লোডিং-আনলোডিং শ্রমিক, কিছু অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা, আনসার সদস্য এবং বিমানবন্দরের বাইরের দালালরা সরাসরি জড়িত। প্রবাসীদের লাগেজ থেকে মালামাল চুরির পেছনে মূলত বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও লোডিং কাজে নিয়োজিত কিছু অসাধু ব্যক্তি দায়ী। তাদের এই কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চললেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা

সরকার প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধে একাধিকবার নির্দেশনা দিলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে ‘এভিয়েশন সিকিউরিটি’ বা এভসেক (AVSEC) গঠন করা হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) প্রবাসীদের অভিযোগ শোনার জন্য হটলাইন নম্বরও চালু করেছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তদারকির অভাবে এই সিন্ডিকেটগুলো পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।

রেমিট্যান্সের প্রভাব: অর্থনৈতিক অর্থনীতির স্তম্ভ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান অপরিসীম। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের মোট জিডিপিতে (GDP) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

  • বার্ষিক রেমিট্যান্সের পরিমাণ: বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রবাসীরা গড়ে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান।
  • অর্থনৈতিক গুরুত্ব: দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান উৎসই হলো প্রবাসী আয়। পরিবারের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে এই অর্থের কোনো বিকল্প নেই।
  • মোট আয়ের হার: জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ এই রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশ এই প্রবাসী আয় থেকে আসে।

একজন প্রবাসী যখন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখেন, তখন বিমানবন্দরের এই হয়রানি তাদের জন্য কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং আত্মসম্মানের ওপর আঘাত। একটি স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য, তাই বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।বিমানবন্দরের হয়রানি দূর করতে হলে কেবল আইন করলেই হবে না, বরং এর কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। প্রতিটি লাগেজের ওপর ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা, সিসিটিভি ফুটেজ ২৪ ঘণ্টা মনিটর করা এবং দোষী প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত ও মামলার ব্যবস্থা করা উচিত। দালাল মুক্ত বিমানবন্দর করতে হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও কঠোর হতে হবে।প্রবাসীরা আমাদের অর্থনীতির অঘোষিত দূত। তাদের সম্মান রক্ষা করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। আশা করি, কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের এই দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে। দেশের উন্নয়নের জন্য প্রবাসীদের হাসিমুখ এবং নিরাপদ প্রত্যাগমন নিশ্চিত করাই হোক আগামীর অগ্রাধিকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here