নিউজ ডেস্ক : পাবনা নিউজ ২৪
বিশ্বের শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় বাহ্যিকভাবে তিন ধাপের উন্নতি ঘটলেও নেপথ্য চিত্রে রয়েছে ভিন্ন বার্তা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের প্রকাশিত ২০২৬ সালের মধ্যবর্ষের নতুন বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। তবে র্যাংকিংয়ে উন্নতি ঘটলেও বাস্তবে ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধায় ভ্রমণের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ভ্রমণ স্বাধীনতার স্থবিরতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান
হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৯৯টি পাসপোর্ট এবং ২২৭টি ভ্রমণ গন্তব্যের ওপর চালিত মূল্যায়নে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৯৭তম। গত বছর ১০০তম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ এ বছর তিন ধাপ এগিয়ে ৯৭ নম্বরে উন্নীত হয়েছে। তবে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো—র্যাংকিংয়ে উত্তরণ ঘটলেও বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল গন্তব্যের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিকরা আগাম ভিসা ছাড়াই বিশ্বের মাত্র ৩৫টি দেশ ও অঞ্চলে প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন, যা বিগত বছরগুলোতে ৩৭টি বা তারও বেশি ছিল। এই সূচকে যৌথভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে একই অবস্থানে রয়েছে উত্তর কোরিয়া। অন্যদিকে তালিকার শীর্ষে যথারীতি অবস্থান করছে সিঙ্গাপুর, যাদের নাগরিকরা বিশ্বের ১৯২টি গন্তব্যে বাধাহীনভাবে ভ্রমণ করতে পারেন। আর সবচেয়ে পেছনের সারিতে রয়েছে আফগানিস্তান।
এশিয়ান গন্তব্যের প্রকৃত চিত্র ও আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মোট ৩৫টি দেশ ও অঞ্চলে ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল প্রবেশের সুযোগ থাকলেও এশীয় অঞ্চলের নির্দিষ্ট কিছু দেশের ক্ষেত্রে এই সুবিধা অত্যন্ত সীমিত। দক্ষিণ এশিয়া ও এর আশপাশের মাত্র কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা এই সুবিধা ভোগ করতে পারছেন। যার মধ্যে রয়েছে শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, কম্বোডিয়া এবং তিমুর-লেস্তে। এশিয়ার বিশাল অর্থনৈতিক বাজার এবং উন্নত দেশগুলোতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে জটিল ভিসা প্রক্রিয়া এখনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে র্যাংকিংয়ের সংখ্যাগত দিক দিয়ে সামান্য হেরফের হলেও সাধারণ ভ্রমণপিপাসী কিংবা পেশাদার যাত্রীদের জন্য বৈশ্বিক চলাচলের পরিধি আদতে প্রসারিত হয়নি।
র্যাংকিংয়ের উন্নতি কিন্তু সুযোগ হ্রাস কেন?
প্রশ্ন উঠতে পারে, ভিসামুক্ত দেশের সংখ্যা কমা সত্ত্বেও কীভাবে র্যাংকিংয়ে তিন ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ? আন্তর্জাতিক এই ইনডেক্স তৈরির মূল ভিত্তি কেবল কোনো একটি দেশের অর্জিত সুবিধার ওপর নির্ভর করে না, বরং এর সঙ্গে বৈশ্বিক অন্যান্য দেশের তুলনামূলক অবস্থানের পরিবর্তনও জড়িত। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্বের অন্যান্য কিছু দেশের পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে অবনতি হওয়ায় বা সূচকের সার্বিক বিন্যাসে রদবদল আসায় বাংলাদেশ পয়েন্টের দিক থেকে কিছুটা ওপরের ধাপে উঠে এসেছে। এর পেছনে বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক বা ভ্রমণবান্ধব নীতিতে বড় কোনো যুগান্তকারী পরিবর্তন কাজ করেনি। বরং দুটি গন্তব্য থেকে এই সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে সার্বিক সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও দূরবর্তী চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি দেশের পাসপোর্টের শক্তি নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কূটনীতি, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অভিবাসন শৃঙ্খলার ওপর। গ্লোবাল মবিলিটি বা বৈশ্বিক গতিশীলতার এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ আজও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। আফ্রিকার অনুন্নত বা উন্নয়নশীল অনেক দেশের পাসপোর্টের চেয়েও পিছিয়ে থাকার বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের জন্য ভাবনার খোরাক জোগাতে পারে। দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার এবং পাসপোর্টের আধুনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক ভিসা সহজীকরণ চুক্তি স্বাক্ষর এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় কেবল সংখ্যাগত মারপ্যাঁচে র্যাংকিংয়ের এদিক-সেদিক হলেও বৈশ্বিক ভ্রমণ স্বাধীনতার আসল সুফল থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে দেশের সাধারণ মানুষ।