প্রয়োজনের তুলনায় জনবল অর্ধেক, শয্যার চেয়ে রোগী তিনগুণ; নানা সংকটের মধ্যেও দিনরাত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
পাবনা বিশেষ প্রতিনিধি, পাবনা নিউজ ২৪: পাবনা জেলার প্রায় ৩০ লাখ মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল পাবনা জেনারেল হাসপাতাল (সদর হাসপাতাল)। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালটিতে প্রতিদিন ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন থেকে চারগুণ বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। শয্যা না পেয়ে মেঝেতে কিংবা বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নেওয়া এখন এখানকার নিত্যদিনের চিত্র। বিশাল এই জনচাপের মুখে সীমিত জনবল ও অবকাঠামো নিয়ে কীভাবে চলছে পাবনার প্রধান এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র? পাবনা নিউজ ২৪-এর বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সেই চিত্র।
শয্যা সংকট ও বারান্দার উপচে পড়া ভিড়
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডের কোনো বেডই খালি নেই। এমনকি ওয়ার্ডের ভেতরের মেঝে ছাড়িয়ে করিডোর এবং হাসপাতালের প্রবেশমুখের বারান্দাতেও ম্যাট বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা। সুজানগর থেকে আসা এক রোগীর স্বজন জানান, “তিনদিন ধরে বারান্দায় আছি, বেড খালি নাই। ডাক্তাররা এসে দেখে যাচ্ছেন, কিন্তু এই গরমে বারান্দায় থাকা খুব কষ্টকর।” হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, ২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী ভর্তি থাকেন, বহির্বিভাগে (OPD) চিকিৎসা নেন আরও হাজারখানেক মানুষ।
জনবল সংকট: অর্ধেকেরও কম লোকবলে চলছে সেবা
হাসপাতালটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনবল ঘাটতি। প্রথম শ্রেণীর চিকিৎসক থেকে শুরু করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সিংহভাগ পদই শূন্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, “একজন ডাক্তারকে প্রতিদিন যেখানে ২০ থেকে ৩০ জন রোগী দেখার কথা, সেখানে আমাদের দেখতে হচ্ছে একশোরও বেশি। এর ফলে অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না।” চিকিৎসকদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের পরও জনবল সংকটের কারণে রোগীরা অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
দালাল চক্র ও এক্স-রে মেশিনের ‘অসুখ’
সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ কম হলেও সাধারণ রোগীদের বড় অভিযোগ আধুনিক ডায়াগনস্টিক সেবার অভাব নিয়ে। মাঝে মাঝেই এক্স-রে বা আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন নষ্ট থাকার কারণে রোগীদের বাধ্য হয়ে বাইরের প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে হয়। আর এই সুযোগটিই নেয় স্থানীয় দালাল চক্র। হাসপাতালের গেটে এবং ওয়ার্ডের আশেপাশে ওত পেতে থাকা দালালেরা গ্রামীণ ও অসচেতন রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই চক্রটির দৌরাত্ম্য বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোর দাবি সাধারণ মানুষের।
আশার আলো ও উত্তরণের উপায়
নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হাসপাতালের পজিটিভ দিক হলো—জরুরি ওষুধ সরবরাহ এখন আগের চেয়ে অনেক উন্নত এবং ২৪ ঘণ্টা জরুরি বিভাগ খোলা থাকছে। তবে পাবনাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, এই হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা এবং দ্রুত শূন্য পদে ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ দেওয়া। একই সাথে দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে পাবনা সদর হাসপাতাল সত্যিই হয়ে উঠতে পারে সাধারণ মানুষের আস্থার শেষ ঠিকানা।