১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। আর এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যে কজন অকুতোভয় রণনায়ক নিজেদের অসামান্য রণকৌশল আর সাহসিকতা দিয়ে শত্রুকে পরাস্ত করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন এয়ার ভাইস मार्शल খাদেমুল বাশার (বীর উত্তম)। তিনি কেবল একজন দক্ষ বিমান চালকই ছিলেন না, বরং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সফল সেক্টর কমান্ডার এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বিমান বাহিনী গঠনের অগ্রদূত।
পাবনার মাটি থেকে উঠে আসা এই অদম্য বীরের জীবন ও দেশের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ আমাদের জন্য এক পরম গৌরবের বিষয়। আজ ‘পাবনা নিউজ ২৪’-এর বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা স্মরণ করবো পাবনার এই বীর সন্তানকে।
পাবনার শিকড় ও সামরিক জীবনের সূচনা
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর পাবনা শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন খাদেমুল বাশার। তাঁর শৈশব ও কৈশোরের একটা বড় সময় কেটেছে পাবনার আলো-বাতাসে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল আকাশের সীমানা ছোঁয়ার। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই ১৯৫৩ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন।
নিজের মেধা ও দক্ষতার জোরে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধবিমানের একজন অত্যন্ত চৌকস পাইলট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৭১ সালের শুরুর দিকে তিনি স্কোয়াড্রন লিডার হিসেবে ঢাকার কুর্মিটোলা বিমান ঘাঁটিতে দায়িত্বরত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব: ৬ নং সেক্টরের সফল কমান্ডার
১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালিদের ওপর বর্বরোচিত হামলা শুরু করে, তখন খাদেমুল বাশার আর চুপ করে বসে থাকতে পারেননি। মাতৃভূমির টানে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৬ নং সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেয়। রংপুর এবং দিনাজপুরের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী অঞ্চল নিয়ে গঠিত এই সেক্টরটি ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
খাদেমুল বাশার স্থলবাহিনীর কোনো প্রথাগত অফিসার না হয়েও, তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা ও রণকৌশল দিয়ে এই সেক্টরটি পরিচালনা করেন। তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ওই অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীকে কোণঠাসা করে ফেলে এবং একের পর এক এলাকা মুক্ত করতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই অসামান্য বীরত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক “বীর উত্তম” খেতাবে ভূষিত করে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গঠন ও দেশের আকাশ রক্ষা
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শূন্য থেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গড়ে তোলার এক বিশাল দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। তিনি বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ উইং কমান্ডার এবং পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে বিমান বাহিনী প্রধান (Air Chief) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই আধুনিক বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল।
একটি ট্র্যাজিক বিদায়
দেশের আকাশ সীমানা সুরক্ষিত রাখার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, সেই আকাশের বুকেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৭৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর, নিজের ৪১তম জন্মদিনে, ঢাকা বিমান বন্দরের রানওয়ে উদ্বোধনের পর একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে এক বিমান দুর্ঘটনায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন। দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে তাঁর এই অকাল মৃত্যু পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল বিমান ঘাঁটির নামকরণ করা হয় “বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি খাদেমুল বাশার”।
শেষ কথা
এয়ার ভাইস মার্শাল খাদেমুল বাশার ছিলেন দেশপ্রেম ও সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পাবনার এই বীর সন্তান নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন যে, দেশের স্বাধীনতার জন্য কীভাবে লড়তে হয় এবং দেশ গঠনের জন্য কীভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয়।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু বাংলাদেশের মুক্ত আকাশে যখনই আমাদের বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো ডানা মেলে, তখনই যেন প্রতিধ্বনিত হয় খাদেমুল বাশারের মতো বীরদের স্বপ্ন। পাবনার এই অমর সন্তানের প্রতি পাবনা নিউজ ২৪ পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা ও সালাম।