বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের সাথে জড়িয়ে আছে হরেক রকমের খাবার। আর যখন কথা হয় ঐতিহ্যবাহী পাবনা জেলার, তখন মানসিক হাসপাতাল কিংবা রূপপুরের আগে মাথায় আসে এখানকার অনন্য রন্ধনশৈলী। কিন্তু আধুনিক ফাস্টফুড আর যান্ত্রিক জীবনের ভিড়ে পাবনার কিছু আদিম, ঐতিহ্যবাহী এবং জাদুকরী স্বাদের খাবার আজ বিলুপ্তির পথে।
আজকের বিশেষ ফিচারে আমরা খুঁজবো পাবনার রান্নাঘরের সেই হারিয়ে যাওয়া কিছু অনন্য স্বাদ, যা একসময় পাবনাবাসীর অহংকার ছিল।
১. পাবনার রাজকীয় ‘দুধ-কদু’ (ক্ষীর-লাউ)
পাবনার গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে বেড়া ও সাঁথিয়া এলাকার পুরোনো বিয়েবাড়ি বা মেহমানদারির একটি অপরিহার্য পদ ছিল ‘দুধ-কদু’। এটি সাধারণ লাউয়ের তরকারি নয়, বরং একটি রাজকীয় ডেজার্ট।
তৈরির রহস্য: কচি লাউ মিহি করে কুচিয়ে, চিপে পানি ফেলে দিয়ে তা ঘন দুধে জ্বাল দেওয়া হতো। সাথে মেশানো হতো এলাচ, দারুচিনি এবং খাঁটি গাওয়া ঘি।
বর্তমান অবস্থা: একসময় পাবনার নানি-দাদিদের হাতের এই স্পেশাল মিষ্টি পদটি ছাড়া অতিথি আপ্যায়ন অপূর্ণ থাকতো। আজ মেহমানদারিতে প্লাস্টিকের কাপের আইসক্রিম বা রসগোল্লা জায়গা করে নিলেও, হারিয়ে গেছে সেই পরম মমতায় তৈরি দুধ-কদুর স্বাদ।
২. চাটমোহরের মাটির চুলার ‘পোড়া-কলাইয়ের রুটি’ ও বেগুন ভর্তা
কলাইয়ের রুটি বললেই সবার আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কথা মনে পড়ে। কিন্তু পাবনার চলনবিল অঞ্চল, বিশেষ করে চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়ায় কলাইয়ের রুটির এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আদিম সংস্করণ ছিল।
পাবনার চেনা সেই সকাল: > শীতের সকালে বা বর্ষার মেঘলা দিনে মাটির তাওয়ায় তৈরি হতো মাশকালাইয়ের আটার মোটা রুটি। এর বিশেষত্ব ছিল, রুটিটি বানানোর পর জ্বলন্ত কয়লার আগুনে হালকা পুড়ে নেওয়া হতো, যা একধরণের ‘স্মোকি ফ্লেভার’ (পোড়া সুবাস) আনতো। কাঁচা মরিচ, খাঁটি শর্ষের তেল আর পোড়া বেগুনের ভর্তা দিয়ে এই রুটি ছিল পাবনার কৃষকদের শক্তির উৎস। আজ ওভেনের যুগে এই আদিম স্বাদ প্রায় ইতিহাস।
৩. সুজানগরের ঐতিহ্যবাহী ‘নোনতা খুরমা’ ও ‘মুরালী’
মিষ্টি খুরমা বা মুরালী দেশের সব জায়গায় পাওয়া গেলেও, পাবনার সুজানগর এবং দুলাই অঞ্চলের হাটে-বাজারে একসময় পাওয়া যেত ‘নোনতা খুরমা’।
এটি ময়দা, কালোজিরা এবং হালকা লবণ দিয়ে মুচমুচে করে ভেজে চিনির শিরায় অল্প সময় ডুবিয়ে তোলা হতো। মিষ্টি আর নোনতার এই মিশেল বিকেলের চায়ের আড্ডায় পাবনাবাসীর প্রথম পছন্দ ছিল।
এখন বেকারি আইটেমের ভিড়ে এই লোকজ স্ন্যাক্সগুলো শুধু গ্রামীণ কিছু গ্রামীণ হাটে তাও বিলুপ্তপ্রায় অবস্থায় টিকে আছে।
৪. পদ্মাপাড়ের ‘কাঁচা আমের নোনতা আচার’ (তেল ছাড়া)
আচারের ঐতিহ্য আমাদের সবার ঘরেই আছে, কিন্তু পাবনার পাকশী ও ঈশ্বরদী অঞ্চলের চরে একসময় একধরণের বিশেষ ‘তেল ছাড়া শুকনো চাটনি বা আচার’ তৈরি হতো। রোদে শুকিয়ে আমকে লবণ ও বিশেষ মসলায় জারিত করে মাটির পাত্রে বছরের পর বছর রাখা হতো। তীব্র গরমে পান্তা ভাতের সাথে এই আচার ছিল অমৃত। তেল ও প্রিজারভেটিভের ভিড়ে এই প্রাকৃতিক সংরক্ষণ পদ্ধতি আজ আর চোখেই পড়ে না।
ঐতিহ্যের স্বাদ ধরে রাখার আহ্বান
খাবার কেবল পেট ভরায় না, খাবার একটি অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখে। পাবনার এই হারিয়ে যাওয়া রেসিপিগুলো যদি আমরা আমাদের ডাইনিং টেবিলে ফিরিয়ে না আনি, তবে আগামী প্রজন্ম জানবেই না তাদের পূর্বপুরুষদের খাদ্য সংস্কৃতির গভীরতা কতটা সমৃদ্ধ ছিল। পাবনা শহর ও উপজেলার তরুণ সমাজ এবং হোম-শেফরা পারেন এই হারিয়ে যাওয়া স্বাদগুলোকে বাণিজ্যিক বা ঘরোয়াভাবে আবার বাঁচিয়ে তুলতে।