বাঙালির শেষপাতে মিষ্টিমুখ মানেই যেন রসগোল্লা, সন্দেশ কিংবা ক্ষীরমোহন। তবে এই সবকিছুর ভিড়ে একটি খাবারের নাম শুনলেই জিভে জল চলে আসে না, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়। তা হলো ঐতিহ্যবাহী ‘বগুড়ার দই’। স্বাদ, সুগন্ধ আর তৈরির অনন্য কৌশলের কারণে বগুড়ার দই কেবল বাংলাদেশেই নয়, সারাবিশ্বেই এক নামে পরিচিত। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এই দইয়ের গৌরব আন্তর্জাতিক মহলে আরও এক ধাপ উঁচুতে পৌঁছে গেছে।
আসুন জেনে নেওয়া যাক, কী এমন জাদু আছে বগুড়ার দইয়ে, যা একে অন্য সব অঞ্চলের দই থেকে আলাদা করে তুলেছে।
বগুড়ার দইয়ের ইতিহাস: কীভাবে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা?
বগুড়ার দইয়ের ইতিহাস প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে শেরপুরের (বগুড়ার একটি উপজেলা) ঘোষ পরিবারের হাত ধরে এই দইয়ের উৎপত্তি। স্থানীয়দের মতে, গৌর গোপাল পাল নামের এক ঘোষ প্রথম এই বিশেষ ঘরানার দই তৈরি শুরু করেন। পরবর্তীতে নবাব আলতাফ আলী চৌধুরীসহ বগুড়ার তৎকালীন জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই দইয়ের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়া থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পর্যন্ত অনেকেই এই দইয়ের স্বাদে মুগ্ধ হয়েছিলেন। কথিত আছে, আইয়ুব খান এই দইয়ের স্বাদ পেয়ে এতটাই আপ্লুত হয়েছিলেন যে, তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর নেতাদের উপহার হিসেবে বগুড়ার দই পাঠিয়েছিলেন।
কেন অনন্য বগুড়ার দই? (তৈরির গোপন রহস্য)
অনেকেই মনে করেন, সাধারণ দই আর বগুড়ার দইয়ের মধ্যে হয়তো তেমন কোনো তফাত নেই। কিন্তু আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এর প্রস্তুতপ্রণালী এবং কন্ডিশনে।
- দুধের ঘনত্ব: বগুড়ার দই তৈরির জন্য গাভীর খাঁটি দুধকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দিয়ে এক-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি ঘন করা হয়।
- মাটির পাত্রের ম্যাজিক: এই দই সবসময় বিশেষভাবে তৈরি মাটির সরা বা পাত্রে জমানো হয়। মাটির পাত্রের একটি অনন্য গুণ হলো, এটি দইয়ের অতিরিক্ত পানি শুষে নেয়। ফলে দইটি যেমন ঘন হয়, তেমনি এর স্বাদ ও সুগন্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়।
- অনন্য কারিগরি: দুধ জ্বাল দেওয়ার পর তা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এনে দইয়ের ‘বীজ’ বা সাঁচ মেশানো হয়। এরপর সারারাত কম্বল বা চট দিয়ে ঢেকে একটি নির্দিষ্ট ঘরের তাপমাত্রায় রাখা হয়। এই নিখুঁত তাপমাত্রার পরিমাপই বগুড়ার দইকে দেয় এর সিগনেচার টেক্সচার।
প্রকারভেদ: সাদা দই বনাম ক্ষীরসা দই
বগুড়ায় মূলত দুই ধরনের দই পাওয়া যায়:
১. সাদা বা টক-মিষ্টি দই: যা সাধারণত রেগুলার খাবারের সাথে বা ডায়াবেটিস রোগীদের পছন্দের তালিকায় থাকে।
২. মিষ্টি বা ক্ষীরসা দই: এটিই মূলত বগুড়ার আসল আকর্ষণ। চিনি পুড়িয়ে বিশেষ ক্যারামেল তৈরি করে দুধে মেশানোর ফলে এর রঙ লালচে বা খয়েরি হয়। এটি ওপরে চামচ দিলেই মাখনের মতো নরম ও ঘন ক্ষীরের অনুভূতি দেয়।
কোথায় পাবেন আসল বগুড়ার দই?
বগুড়া শহরের আনাচে-কানাচে শত শত দইয়ের দোকান মিলবে। তবে আসল স্বাদের খোঁজে যারা যান, তাদের প্রথম পছন্দ থাকে:
- এশিয়া সুইটস
- মহরম আলী দই ঘর
- চিলড্রেন
- শ্যামলী ও আকবরিয়া
শেফ ও ভোজনরসিকদের মতে, বগুড়ার শেরপুর এলাকার স্থানীয় ঘোষেদের তৈরি দইয়ের স্বাদ এখনো সবচেয়ে খাঁটি ও ঐতিহ্যবাহী।
বগুড়ার দই শুধু একটি মিষ্টি খাবার নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিয়ে, ঈদ, পূজা কিংবা যেকোনো উৎসব—বগুড়ার দই ছাড়া যেন বাঙালির আতিথেয়তাই অপূর্ণ থেকে যায়। তাই উত্তরবঙ্গে ঘুরতে গেলে বা ঘরোয়া আড্ডায় মিষ্টির খোঁজ পড়লে, আসল মাটির সরার বগুড়ার দইয়ের চেয়ে সেরা বিকল্প আর কিছুই হতে পারে না।