Home ফিচার শেয়ার বাজারে রেকর্ড লেনদেনের জোয়ার, এর মাঝেই ৬২ কোম্পানিতে ‘রেড অ্যালার্ট’

শেয়ার বাজারে রেকর্ড লেনদেনের জোয়ার, এর মাঝেই ৬২ কোম্পানিতে ‘রেড অ্যালার্ট’

0
শেয়ার বাজারে রেকর্ড লেনদেনের জোয়ার, এর মাঝেই ৬২ কোম্পানিতে ‘রেড অ্যালার্ট’

নিউজ ডেস্ক: পাবনা নিউজ ২৪

বিশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদন: চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে। সাধারণত অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা গেলেও এবার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। কর রেয়াত বা ‘ট্যাক্স রিবেট’ সুবিধা পাওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ও সুযোগকে কাজে লাগাতে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বাজারে বিপুল পরিমাণ নতুন পুঁজি বা ফ্রেশ ফান্ড ইনজেকশন করছেন। যার ফলশ্রুতিতে গতকাল ও আজকের লেনদেনে ডিএসইর প্রধান সূচক এবং দৈনন্দিন টার্নওভার বা লেনদেনের পরিমাণে এক অবিশ্বাস্য গতি লক্ষ্য করা গেছে।

পুঁজিবাজারের এই সাম্প্রতিক বড় ধরনের উত্থান, খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিএসইর বিশেষ সতর্কবার্তা নিয়ে আমাদের আজকের এই বিস্তারিত ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।

ট্যাক্স রিবেটের প্রভাব ও সূচকের ঐতিহাসিক লাফ

বাংলাদেশের আয়কর আইন অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে নির্দিষ্ট পরিমাণের বিনিয়োগের বিপরীতে করদাতারা বড় অঙ্কের কর রেয়াত বা ট্যাক্স ক্রেডিট পেয়ে থাকেন। ৩০ জুনের মধ্যে এই বিনিয়োগ সম্পন্ন করার শেষ বাধ্যবাধকতা থাকায় গত কয়েকদিন ধরেই বাজারে নতুন টাকার প্রবাহ বাড়ছিল, যা গতকাল ও আজ চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শেষ মুহূর্তের এই মূলধন ইনজেকশনের কারণে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স (DSEX) এক লাফে ৬৬.৯৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫,৭১৯ পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করেছে। পুঁজিবাজারের ইতিহাস ও চার্ট বিশ্লেষণ করে বাজার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিগত ২২ মাসের মধ্যে ডিএসইর সূচকের এটিই সর্বোচ্চ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান। গত প্রায় দুই বছর ধরে বাজারে যে এক ধরণের তারল্য সংকট এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার অভাব ছিল, এই একটি বড় উত্থান যেন সেই পুরো জটলাকেই এক নিমেষে কেটে দিয়েছে।

লেনদেনের জোয়ার: ২৩.৪% প্রবৃদ্ধির নতুন রেকর্ড

সূচকের পাশাপাশি বাজারি গতিশীলতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণে। বিনিয়োগকারীদের আগ্রাসী শেয়ার ক্রয়ের কারণে ডিএসইতে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ এক ধাক্কায় ২৩.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। টাকার অঙ্কে গতকালের মোট লেনদেন গিয়ে ঠেকেছে ১৩,৭১০ কোটি টাকায় (১৩.৭১ বিলিয়ন টাকা), যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে একক দিনে অন্যতম সর্বোচ্চ লেনদেনের রেকর্ড।

বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই উত্থান কেবল গুটিকয়েক বড় শেয়ারের ওপর ভর করে হয়নি, বরং এটি ছিল একটি সামগ্রিক বা ‘ব্রড-বেসড’ উত্থান। ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে:

দর বেড়েছে: ২১৯টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের।

দর কমেছে: ১৩৮টি কোম্পানির।

অপরিবর্তিত ছিল: বাকি অন্যান্য কোম্পানির শেয়ার দর।

অগ্রগামী বা দর বৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানির সংখ্যা দর হারানো কোম্পানির চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় বাজার এখন পুরোপুরি ‘বুলিশ’ বা ঊর্ধ্বমুখী ট্রেন্ডে অবস্থান করছে।

খাতভিত্তিক লেনদেন বিশ্লেষণ: শীর্ষে ব্যাংকিং সেক্টর

চলতি সপ্তাহের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় পছন্দের জায়গা ছিল দেশের ব্যাংকিং খাত। মোট দৈনিক লেনদেনের প্রায় ১৬.৩% এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে ব্যাংকিং খাত। ব্যাংকিং খাতের অধিকাংশ ভালো মানের (ব্লু-চিপ) শেয়ারের দাম বাড়ার কারণে সূচক এত দ্রুত ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পেরেছে।

ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল বিবিধ (Miscellaneous) খাত এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রকৌশল খাত। এই দুই খাতের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক বাইং প্রেশার বা ক্রয়ের চাপ লক্ষ্য করা গেছে। মূলত দীর্ঘমেয়াদে লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড পাওয়ার আশা এবং কর রেয়াতের দ্বৈত সুবিধার কথা মাথায় রেখেই বড় বিনিয়োগকারীরা এই খাতগুলোতে নিজেদের ফান্ড পার্ক করছেন।

 ডিএসইর ‘রেড অ্যালার্ট’: ৬২টি দুর্বল কোম্পানি নিয়ে সতর্কতা

বাজার যখন অত্যন্ত চাঙ্গা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যখন বিপুল উৎসাহে শেয়ার কিনছেন, ঠিক তখনই নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাজারকে কারসাজিমুক্ত রাখতে এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পুঁজি রক্ষা করতে ডিএসই সম্প্রতি ৬২টি বন্ধ, উৎপাদনহীন এবং চরম আর্থিকভাবে দুর্বল কোম্পানিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছে।

এই কোম্পানিগুলোর জন্য ডিএসইর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ‘রেড অ্যালার্ট’ বা লাল সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে। ডিএসই সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়েছে যে, বাজারের এই সামগ্রিক উত্থানের সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু চক্র বা গ্যাম্বলার দল যেন এই পচা বা ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারগুলোর দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলতে না পারে, সেজন্যই এই অগ্রিম সতর্কতা। বিনিয়োগকারীদের প্রতি কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন কেবল সূচকের সবুজ বাতি দেখে যেকোনো শেয়ারে অন্ধভাবে বিনিয়োগ না করেন।

 বাজার নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন

পুঁজিবাজারের এই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদদের মতে, ৩০ জুনের পর কর রেয়াতের এই তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে বাজারে যে নতুন তহবিল প্রবেশ করেছে, তা আগামী অর্থবছরের শুরুতে বাজারকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দেবে।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে আবেগের বশে বিনিয়োগ না করে কোম্পানির অতীত পারফরম্যান্স, পিই রেশিও (P/E Ratio) এবং কোম্পানির বর্তমান উৎপাদন অবস্থা দেখে বিনিয়োগ করা উচিত। ডিএসই যে ৬২টি কোম্পানিকে লাল তালিকাভুক্ত করেছে, সেগুলোকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলাই এই মুহূর্তে বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here