পারিবারিক জমিজমা বা সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে ভাই-বোন কিংবা আত্মীয়দের মধ্যে বিরোধ এ দেশের আদালতগুলোর দেওয়ানি মামলাগুলোর অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক সময় ওসিয়তনামা (উইল) কিংবা হেবা (দান) করার সঠিক আইনি নিয়ম না জানার কারণে পরবর্তীতে পরিবারে দীর্ঘমেয়াদী মামলা-মোকাদ্দমা এবং আজীবন দূরত্বের সৃষ্টি হয়।
নিজের কষ্টার্জিত সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে বণ্টন করতে এবং ভবিষ্যতের আইনি জটিলতা এড়াতে ওসিয়ত ও হেবা আইনের সঠিক নিয়মগুলো জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
ওসিয়তনামা বা উইলের আইনি নিয়ম
মুসলিম আইন অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি তার মৃত্যুর পর সম্পত্তি কীভাবে বণ্টিত হবে তা জীবিত থাকা অবস্থায় লিখে যেতে পারেন, যাকে ওসিয়ত বলা হয়। তবে ওসিয়ত করার ক্ষেত্রে কিছু কঠোর আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
- এক-তৃতীয়াংশের নিয়ম: একজন ব্যক্তি তার মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ ( $\frac{1}{3}$ অংশ) পরিমাণ সম্পত্তি অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে ওসিয়ত করতে পারেন।
- উত্তরাধিকারীদের সম্মতি: যদি কেউ তার কোনো আইনগত উত্তরাধিকারীকে (যেমন নির্দিষ্ট কোনো সন্তানকে) অন্য ওয়ারিশদের বঞ্চিত করে ওসিয়ত করতে চান, তবে ওসিয়তকারীর মৃত্যুর পর বাকি সমস্ত উত্তরাধিকারীদের সম্মতি আবশ্যক। যদি অন্য কোনো ওয়ারিশ এতে দ্বিমত পোষণ করেন, তবে সেই ওসিয়তনামা আইনিভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
হেবা বা দানপত্রের সঠিক নিয়ম
জীবিত থাকা অবস্থায় নিজের সম্পত্তির মালিকানা কাউকে সম্পূর্ণ হস্তান্তর করতে চাইলে ‘হেবা’ বা দান করা সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকরী মাধ্যম। হেবার ক্ষেত্রে ওসিয়তের মতো কোনো সীমাবদ্ধতা নেই—ব্যক্তি চাইলে তার সম্পূর্ণ সম্পত্তিই হেবা করতে পারেন।
- হেবা রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক: মুসলিম আইনে মুখে মুখে হেবা বা দান করার নিয়ম থাকলেও, ২০০৫ সালের সংশোধিত আইন অনুযায়ী যেকোনো হেবা বা দান অবশ্যই লিখিত এবং রেজিস্ট্রি (নিবন্ধন) করতে হবে। মৌখিক বা সাদা কাগজে লিখে রাখা হেবার এখন কোনো আইনি মূল্য নেই।
- নামমাত্র খরচ: রক্তের নিকটতম সম্পর্কের আত্মীয়দের (যেমন: বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন, দাদা-দাদি, নানা-নানি) মধ্যে হেবা দলিল করার সরকারি খরচ অত্যন্ত নামমাত্র করা হয়েছে, যাতে সহজেই পরিবারের ভেতর সম্পত্তি হস্তান্তর করা যায়।
- শর্তহীন মালিকানা: হেবা দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের সাথে সাথেই গ্রহীতা ওই সম্পত্তির সম্পূর্ণ এবং চূড়ান্ত মালিক হয়ে যান।
মামলা-মোকাদ্দমা এড়াতে আইনজ্ঞদের পরামর্শ
জমিজমা সংক্রান্ত পারিবারিক বিরোধ এড়াতে আইন বিশেষজ্ঞরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে থাকেন:
১. যেকোনো সম্পত্তি ওসিয়ত বা দান করার সময় তা শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত সরকারি নিয়ম মেনে রেজিস্ট্রি বা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে নিবন্ধন করিয়ে নিতে হবে।
২. হেবা বা দান করার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে আরএস বা বিএস খতিয়ান অনুযায়ী নামজারি (Mutation) করিয়ে নেওয়া উচিত। নামজারি না করা থাকলে পরবর্তীতে ওই সম্পত্তি বিক্রি বা পুনরায় হস্তান্তর করতে আইনি জটিলতা তৈরি হয়।
৩. ওসিয়তনামা তৈরির সময় অন্তত দুজন নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর স্বাক্ষর এবং সম্ভব হলে নোটারি পাবলিক বা রেজিস্ট্রি করিয়ে নেওয়া ভবিষ্যৎ জালিয়াতির হাত থেকে সম্পত্তিকে রক্ষা করে।
পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে আদালতের চক্কর থেকে বাঁচাতে সঠিক সময়ে সঠিক আইনি প্রক্রিয়া মেনে সম্পত্তি বণ্টন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।