পাবনা নিউজ ২৪
সবুজে ঘেরা পাহাড় আর ঝরনার দেশ আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাহাড়ের এই চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যের পাশাপাশি এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর জীবনযাত্রা এবং খাদ্যাভ্যাসও সমতলের মানুষের কাছে এক পরম বিস্ময়। পাহাড়ি রান্নার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এতে তেল-মশলার ব্যবহার থাকে নামমাত্র, অথচ প্রাকৃতিক উপাদানের সঠিক ব্যবহারে স্বাদ হয় অতুলনীয়। পাহাড়ি অঞ্চলের এমন সব অনন্য খাবারের কথা বলতে গেলে যে নামটি সবার আগে আসে, তা হলো ‘বাঁশ কোড়ল’। চাকমা ভাষায় যাকে পরম আদরে ডাকা হয় ‘মহিল’ (Mehel)। কচি বাঁশের ভেতরের নরম অংশ দিয়ে তৈরি এই খাবারটি যেমন পুষ্টিকর, তেমনই এর রান্নার পদ্ধতিও জাদুকরী। আজকের বিশেষ রসনা প্রতিবেদনে আমরা জানব পাহাড়ের এই সিগনেচার ডিশ ‘বাঁশ কোড়ল’ এবং কাঁচা বাঁশের চোঙায় তেল ছাড়া রান্নার অবিশ্বাস্য কৌশল।
বাঁশ কোড়ল বা ‘মহিল’ আসলে কী?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, শক্ত বাঁশ আবার মানুষ খায় কীভাবে? আসলে সব বাঁশ কিন্তু খাওয়া যায় না, আর বড় বাঁশও খাওয়া হয় না। বর্ষাকালে যখন পাহাড়ের মাটিতে নতুন বাঁশ জন্ম নেয়, তখন মাটির নিচ থেকে যে কচি ডগা বা অঙ্কুরটি মাত্র বের হয়, সেটিকে তুলে আনা হয়। এই কচি ও নরম অংশটিই হলো বাঁশ কোড়ল বা মহিল।
সব ধরণের বাঁশ কোড়ল কিন্তু স্বাদে এক রকম হয় না। পাহাড়ের মুলি বাঁশ, ডলু বাঁশ এবং ফারুয়া বাঁশের কোড়ল সবচেয়ে নরম ও সুস্বাদু হয়ে থাকে। ওপরের শক্ত আবরণটি ছিলে ফেললে ভেতরে হালকা মিষ্টি ও দারুণ সুবাসযুক্ত একটি ধবধবে সাদা নরম অংশ পাওয়া যায়, যা দিয়ে তৈরি হয় পাহাড়ের সেরা সব পদ।
রান্নার বৈচিত্র্য: হরেক স্বাদে বাঁশ কোড়ল

চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ পাহাড়ের প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রান্নাঘরে বাঁশ কোড়ল রান্নার নিজস্ব এবং ইউনিক কিছু রেসিপি রয়েছে। এর বহুমুখী ব্যবহারের কারণে এটি পাহাড়ের মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয়।চাকমা ও মারমাদের অন্যতম প্রিয় রান্না হলো বাঁশ কোড়ল দিয়ে শুঁটকি মাছের ঝোল। পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী বিশেষ এক ধরণের শুঁটকির পেস্ট ‘নাপ্পি’ এবং কাঁচামরিচ দিয়ে যখন কচি বাঁশ কোড়ল রান্না করা হয়, তখন তার ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।বাঁশ কোড়লকে আলুর মতো কুচি কুচি করে কেটে সামান্য হলুদ ও কাঁচামরিচ দিয়ে হালকা তেলে ভাজি করা হয়। এটি খেতে বেশ মুচমুচে এবং মিষ্টি স্বাদের হয়। এছাড়া কাঁচা বাঁশ কোড়ল চিকন করে কেটে ধনেপাতা ও লেবুর রস দিয়ে তৈরি সালাদ পাহাড়ের এক অনন্য স্বাস্থ্যকর খাবার।
কাঁচা বাঁশের চোঙায় রান্না: আদিম ও অবিশ্বাস্য এক শিল্প
বাঁশ কোড়লের সাধারণ রান্নার বাইরে পাহাড়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও আদিম রন্ধনশৈলী হলো কাঁচা বাঁশের চোঙার (Bamboo Tube) ভেতর রান্না করা। চাকমা সমাজে এই বিশেষ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘চুড়োং’ (Churong)। এই পদ্ধতিতে কোনো মেটাল বা ধাতব হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা হয় না, এমনকি এক ফোঁটা তেলও লাগে না!
মেকিং প্রসেস ও ব্যাম্বু চিকেন:
উপাদান তৈরি: কচি বাঁশ কোড়ল এবং দেশি মুরগির মাংসকে (ব্যাম্বু চিকেন) আদা, রসুন, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ এবং পাহাড়ের বিশেষ সুগন্ধি মসলা দিয়ে খুব ভালো করে মেখে নেওয়া হয়।
চোঙায় প্রবেশ: এরপর কাঁচা মুলি বাঁশের এক পাশ কেটে তার ভেতরে এই মাংস ও বাঁশ কোড়লের মিশ্রণটি ঠেসে ঠেসে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। চোঙার মুখটি কলার পাতা দিয়ে শক্ত করে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আগুনে পোড়ানো: এবার এই কাঁচা বাঁশের চোঙাটিকে সরাসরি কাঠের আগুনের কয়লার ওপর রেখে পোড়ানো হয়।
তেল ছাড়া ম্যাজিক: কাঁচা বাঁশটি যখন আগুনে পুড়তে থাকে, তখন বাঁশের ভেতরের প্রাকৃতিক রস ও বাষ্প ছিটকে ভেতরের মাংস ও বাঁশ কোড়লকে সেদ্ধ করে ফেলে। বাঁশের নিজস্ব নির্যাস মাংসের ভেতরে ঢুকে এক স্বর্গীয় সুঘ্রাণ তৈরি করে। সম্পূর্ণ তেল ছাড়া কেবল বাঁশের রসে রান্না হওয়া এই ‘চুড়োং’ বা ‘ব্যাম্বু চিকেন’ মুখে দিলে যে কেউ এর স্বাদ সারাজীবন মনে রাখবে।
পুষ্টিগুণে অনন্য বাঁশ কোড়ল
বাঁশ কোড়ল কেবল স্বাদে অনন্য নয়, এটি পুষ্টিগুণেও ভরপুর। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, কচি বাঁশ কোড়লে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যআঁশ বা ফাইবার, যা হজমপ্রক্রিয়াকে উন্নত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। এতে চর্বি বা ক্যালরির পরিমাণ অত্যন্ত কম থাকায় এটি ওজন কমাতেও সাহায্য করে। এছাড়া এতে থাকা বিভিন্ন খনিজ উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। সম্পূর্ণ অরগানিক বা রাসায়নিকমুক্ত হওয়ায় পাহাড়ের মানুষ এই খাবার খেয়ে দীর্ঘায়ু লাভ করে থাকে।
সমতলের ভোজনরসিকদের মাঝে বাড়ছে জনপ্রিয়তা
একটা সময় ছিল যখন বাঁশ কোড়ল কেবল পাহাড়ের মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান ২০২৬ সালে এসে সমতলের মানুষ এবং শহুরে ভোজনরসিকদের কাছেও এই খাবারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম বা পাবনার মতো বড় বড় শহরের রুফটপ রেস্তোরাঁ কিংবা পাহাড়ি থিমভিত্তিক রেস্টুরেন্টগুলোতে এখন ‘ব্যাম্বু চিকেন’ বা ‘বাঁশ কোড়লের সালাদ’ বেশ চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। অনেকেই খাগড়াছড়ি বা সাজেক ভ্যালিতে ঘুরতে গিয়ে এই অনন্য খাবারের স্বাদ নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন।
প্রকৃতির কোলে জন্ম নেওয়া ‘বাঁশ কোড়ল’ এবং বাঁশের চোঙায় তেল ছাড়া রান্নার এই প্রথা প্রমাণ করে যে, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর রান্নার জ্ঞান কতটা সমৃদ্ধ ও পরিবেশবান্ধব। পাহাড়ের এই ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো আমাদের জাতীয় রন্ধনশিল্প বা ফুড কালচারকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। যদি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এই পাহাড়ি খাবারগুলোকে আরও বড় পরিসরে ব্র্যান্ডিং করা যায়, তবে এটি বাংলাদেশের পর্যটন খাতের জন্য একটি বড় আকর্ষণীয় উপাদান হয়ে উঠতে পারে।