নিউজ ডেস্ক: পাবনা নিউজ ২৪
৩০ জুন, ২০২৬
চলতি জুন মাসে দেশজুড়ে জেঁকে বসেছে তীব্র তাপ্রবাহ। রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল—সবখানেই সুর্যের তীব্রতা এবং অতিরিক্ত আর্দ্রতায় জনজীবন ওষ্ঠাগত। এই তীব্র গরমে স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক যে সমস্যাটি দেখা দেয়, তা হলো ‘হিট স্ট্রোক’। প্রতি বছরই তীব্র তাপ্রবাহের কারণে দেশে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে অনেকের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। চিকিৎসকদের মতে, হিট স্ট্রোক একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি বা জরুরি স্বাস্থ্য বিপর্যয়। সঠিক সময়ে এর লক্ষণ চিনতে না পারলে এবং দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা না দিলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আজকের আর্টিকেলে আমরা জানবো হিট স্ট্রোকের প্রধান লক্ষণগুলো এবং আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে তাৎক্ষণিক করণীয় সম্পর্কে।
হিট স্ট্রোক আসলে কী?
স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের শরীর ঘামের মাধ্যমে ভেতরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু যখন চারপাশের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যায় এবং বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে, তখন শরীরের নিজস্ব তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা থার্মোরেগুলেটরি সিস্টেম কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে তা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট ($104^\circ\text{F}$) বা তার বেশি হতে পারে। শরীর যখন নিজের তাপমাত্রা নিজে কমাতে পারে না, তখন সেই বিপজ্জনক অবস্থাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘হিট স্ট্রোক’ বলা হয়।
হিট স্ট্রোকের প্রধান লক্ষণসমূহ
হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আগে শরীর কিছু সংকেত দেয়, যাকে ‘হিট একজাস্টন’ বা গরমের ক্লান্তি বলা হয়। এই লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই সতর্ক হওয়া জরুরি:
অতিরিক্ত উচ্চ তাপমাত্রা: রোগীর শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ করেই ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হয়ে যায়।
ত্বকের পরিবর্তন: হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বক সাধারণত শুষ্ক ও লালচে হয়ে যায়। শরীর অতিরিক্ত গরম হলেও অনেক সময় ঘাম হওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তীব্র মাথাব্যথা ও মাথা ঘোরানো: প্রচণ্ড গরমে মাথা দপধপ করা, তীব্র মাথাব্যথা হওয়া এবং মাথা ঘোরানোর মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
বমি বমি ভাব: আক্রান্ত ব্যক্তির তীব্র বমি বমি ভাব হতে পারে কিংবা একাধিকবার বমিও হতে পারে।
মানসিক বিভ্রান্তি ও আচরণগত পরিবর্তন: রোগী উল্টোপাল্টা কথা বলতে পারেন, তীব্র খিটখিটে মেজাজ দেখাতে পারেন বা চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে বিভ্রান্ত হতে পারেন।
তীব্র নাড়ির স্পন্দন ও শ্বাসকষ্ট: হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বা পালস রেট খুব দ্রুত হয়ে যায় এবং বুক ধড়ফড় করতে থাকে। সেই সাথে শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত ও অগভীর হয়।
অচেতন হয়ে পড়া: স্ট্রোকের তীব্রতা বেশি হলে রোগী সাময়িকভাবে বা পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়ে বা অচেতন হয়ে পড়তে পারেন।
আক্রান্ত ব্যক্তির তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা
আপনার সামনে যদি কেউ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, তবে অ্যাম্বুলেন্স বা ডাক্তার ডাকার পাশাপাশি চোখের পলকে কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করতে হবে। কারণ এই সময় প্রতিটা সেকেন্ড রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য মূল্যবান।
১. ছায়াযুক্ত বা ঠান্ডা স্থানে নেওয়া: আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব রোদের মধ্য থেকে সরিয়ে কোনো গাছের ছায়ায়, ঠান্ডা ঘরে বা এসি (AC) অন থাকা রুমে নিয়ে আসতে হবে।
২. অতিরিক্ত পোশাক খুলে দেওয়া: রোগীর শরীরে যদি ভারী বা টাইট পোশাক থাকে, তবে তা দ্রুত আলগা করে দিতে হবে বা খুলে ফেলতে হবে, যাতে শরীরের তাপ বাতাসে সহজে বের হতে পারে।
৩. শরীর ঠান্ডা করা: রোগীর পুরো শরীর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে অথবা ভেজা কাপড় বা স্পঞ্জ দিয়ে বারবার মুছে দিতে হবে। যদি সম্ভব হয়, তবে রোগীর বগল, কুঁচকি, ঘাড় ও পিঠে বরফ বা আইস প্যাক দিয়ে রাখতে হবে; কারণ এই স্থানগুলোর রক্তনালী ত্বকের খুব কাছাকাছি থাকে এবং দ্রুত তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
৪. বাতাসের ব্যবস্থা করা: রোগীকে ফ্যানের নিচে শুইয়ে দিতে হবে। ফ্যান না থাকলে হাতপাখা বা যেকোনো কিছু দিয়ে অনবরত বাতাস করতে হবে যাতে গায়ের পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে শরীর ঠান্ডা হয়।
৫. পানি বা স্যালাইন খাওয়ানো (যদি জ্ঞান থাকে): রোগী যদি সম্পূর্ণ সচেতন থাকেন এবং ঢোক গিলতে পারেন, তবে তাকে ঠান্ডা পানি, খাবার স্যালাইন বা ডাবের পানি খাওয়াতে হবে। তবে রোগী যদি আচ্ছন্ন বা অচেতন থাকেন, তবে তাকে জোর করে কোনো তরল খাওয়ানো যাবে না; এতে পানি ফুসফুসে ঢুকে শ্বাসরোধ হতে পারে।
৬. দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর: প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালে নেওয়ার পথেও শরীর ভেজানোর প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে।
হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে কিছু জরুরি সতর্কতা
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। এই তীব্র গরমে সামান্য কিছু নিয়ম মেনে চললে হিট স্ট্রোকের হাত থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করা সম্ভব:
তীব্র রোদে (বিশেষ করে বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত) খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকুন।
বাইরে বের হলে অবশ্যই ছাতা, টুপি, সানগ্লাস ব্যবহার করুন এবং হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরিধান করুন।
তৃষ্ণা না পেলেও দিনে অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার নিরাপদ পানি পান করুন। বাইরে যাতায়াতের সময় সবসময় পানির বোতল ও খাবার স্যালাইন সাথে রাখুন।
চা, কফি, কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত শরবত খাওয়া থেকে বিরত থাকুন, কারণ এগুলো শরীরকে আরও বেশি ডিহাইড্রেটেড বা পানিশূন্য করে তোলে।
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং যারা ঘরের বাইরে কায়িক পরিশ্রমের কাজ করেন, তাদের এই সময়ে বিশেষ নজরে রাখতে হবে।
পাবনা অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান এই তাপ্রবাহে নিজের ও চারপাশের মানুষের স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখুন। লক্ষণ দেখা মাত্রই আতঙ্কিত না হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিন এবং সুস্থ থাকুন।