নিউজ ডেস্ক: পাবনা নিউজ ২৪
৩০ জুন, ২০২৬
দীর্ঘায়িত ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে এসে আরও এক নতুন এবং বিধ্বংসী রূপ ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেনের একাধিক প্রধান শহরে রাশিয়ার ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। রাজধানী কিয়েভসহ ওডেসা এবং খারকিভের মতো জনবহুল অঞ্চলগুলোতে এই হামলা চালানো হয় বলে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এদিকে, যুদ্ধক্ষেত্রের এই ভয়াবহতার মধ্যেই মস্কো থেকে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন স্বীকারোক্তি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনীয় ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়ার অভ্যন্তরে থাকা জ্বালানি অবকাঠামো এবং শোধনাগারগুলো বেশ বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। দুই দেশের এই পাল্টা-পাল্টি আঘাতের ফলে রণক্ষেত্রের উত্তেজনা এখন চরমে পৌঁছেছে।
ইউক্রেনের বেসামরিক এলাকায় রুশ ড্রোনের তাণ্ডব
ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, গত রাতে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ইরানের তৈরি ‘শাহেদ’ ড্রোন এবং ক্রুজ মিসাইল দিয়ে একযোগে ইউক্রেনের বিভিন্ন প্রান্তে হামলা চালায়। ইউক্রেনের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও, বেশ কিছু ড্রোন সরাসরি আঘাত হানে আবাসিক ভবন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে।
সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে ওডেসা বন্দরে, যেখানে একটি বহুতল আবাসিক ভবনে রুশ ড্রোন আঘাত হানলে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৬ জন প্রাণ হারান। এছাড়া খারকিভ ও কিয়েভের উপকণ্ঠে পৃথক হামলায় আরও ৪ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে “রাশিয়ার পরিকল্পিত সন্ত্রাসবাদ” বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং পশ্চিমা মিত্রদের কাছে আরও দ্রুত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের তাগিদ দিয়েছেন।
পুতিনের নজিরবিহীন স্বীকারোক্তি: সংকটে রুশ জ্বালানি খাত
ক্রেমলিনে এক উচ্চপর্যায়ের সরকারি বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্বীকার করেছেন যে, ইউক্রেনের সাম্প্রতিক ড্রোন হামলাগুলো রাশিয়ার মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি অর্থাৎ জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিগত কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার অভ্যন্তরে থাকা বেশ কয়েকটি তেল শোধনাগার (Oil Refineries) এবং জ্বালানি ডিপোকে লক্ষ্য করে নিখুঁত ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
পুতিন বলেন, “ইউক্রেনের এসব হামলা আমাদের দেশের জ্বালানি অবকাঠামোকে কিছুটা সমস্যায় ফেলেছে, এটি সত্য। তবে আমাদের প্রকৌশলীরা দ্রুত এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য কাজ করছেন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে যেন জ্বালানির সংকট না তৈরি হয়, সেজন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।” আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, ইউক্রেন এখন কেবল নিজেদের রক্ষা করছে না, বরং রাশিয়ার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে আঘাত হানার মতো সামরিক সক্ষমতাও অর্জন করেছে।
পাল্টা-পাল্টি কৌশলে যুদ্ধের নতুন মোড়
২০২৬ সালের এই পর্যায়ে এসে যুদ্ধের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রাশিয়া যেখানে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ এবং বিদ্যুৎ গ্রিডকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে ইউক্রেনীয়দের মনোবল ভাঙতে চাইছে; সেখানে ইউক্রেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। কিয়েভ এখন রাশিয়ার অভ্যন্তরে থাকা সামরিক ঘাঁটি, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং তেল ক্ষেত্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
ইউক্রেনের তৈরি দূরপাল্লার আত্মঘাতী ড্রোনগুলো এখন রাশিয়ার কয়েকশো কিলোমিটার ভেতরে অনায়াসে প্রবেশ করতে পারছে। এর ফলে রাশিয়ার সীমান্ত ঘেঁষা শহরগুলোর পাশাপাশি মস্কোর কাছাকাছি অঞ্চলের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোও এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। রাশিয়ার তেল রপ্তানি ব্যাহত হলে দেশটির যুদ্ধকালীন অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে, যা পুতিন প্রশাসনের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব
ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও উর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। বিশ্ব অর্থনীতি যখন মূল্যস্ফীতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই রাশিয়ার জ্বালানি সংকটের এই খবর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, ন্যাটো (NATO) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ইউক্রেনকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে হামলা চালানোর জন্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার পর থেকেই এই যুদ্ধের পরিধি আরও বড় আকার ধারণ করেছে। ওয়াশিংটনের একাংশের আশঙ্কা, রাশিয়ার জ্বালানি খাত পুরোপুরি ভেঙে পড়লে ক্রেমলিন আরও মারাত্মক কোনো সামরিক পদক্ষেপ বা কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিতে পারে।
৩০শে জুনের এই ভয়াবহ আপডেট স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ তো নেই-ই, বরং এটি এখন আরও জটিল অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের দিকে মোড় নিচ্ছে। একদিকে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের লাশের মিছিল, অন্যদিকে রাশিয়ার গর্বের জ্বালানি খাতে ফাটল—এই দুই মিলে পুরো ইউরোপ তথা বিশ্ব আজ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।