নিউজ ডেস্ক: পাবনা নিউজ ২৪
৩০ জুন, ২০২৬
ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এবং পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের এক অমূল্য প্রাকৃতিক আশীর্বাদ ও দুর্ভেদ্য প্রাচীর। আইলা, সিডর, আম্পান থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’—প্রতিটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই বন নিজের বুক দিয়ে ঢাকাকে তথা সমগ্র বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে। মায়ের মতো আগলে রাখা এই বন যদি না থাকত, তবে বাংলাদেশের মানচিত্র আজ হয়তো ভিন্ন হতো। কিন্তু প্রতিনিয়ত সামুদ্রিক ঝড়-ঝাপটা সামলে আমাদের বাঁচিয়ে রাখা সুন্দরবন নিজে এখন কেমন আছে? এর চারপাশের মানুষের সংগ্রামময় জীবনযাত্রা কেমন এবং কীভাবে খুব সহজে ঢাকা থেকে সুন্দরবনে ভ্রমণ করা যায়, তা নিয়ে আজ আমরা এক বিস্তারিত ও তথ্যবহুল আলোচনা করব।
সুন্দরবনের বর্তমান হালহকিকত: প্রকৃতি ও আইনের লড়াই
২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে সুন্দরবনের এক মিশ্র চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। প্রথমত, ইতিবাচক দিকটি যদি আমরা দেখি—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি, কোস্ট গার্ড ও বন বিভাগের ‘স্মার্ট প্যাট্রোলিং’ এবং বনদস্যু দমনের কারণে বনের ভেতরে এখন এক ধরণের শান্তি বিরাজ করছে। এক সময়ের কুখ্যাত বাঘ শিকারী বা হরিণ শিকারী চক্রের আনাগোনা এখন সম্পূর্ণ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
তবে সবচেয়ে বড় নেতিবাচক ধাক্কাটি আসছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বাড়ছে, যা সুন্দরবনের জন্য এক নীরব মহামারী। সুন্দরবনের একটি অবিশ্বাস্য ‘সেলফ-হিলিং’ বা নিজে নিজে ক্ষতবিনিময় করে নতুন করে জেগে ওঠার ক্ষমতা আছে, যার কারণে এটি প্রতিবারই ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার সবুজ হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা এতটাই বেড়ে গেছে যে, বনের এই স্বাভাবিক জীবনচক্র এখন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সুন্দরবনের চারপাশে যারা বাস করছেন: জীবনের ঝুঁকি ও সংগ্রাম
সুন্দরবনের ভেতরের মূল নিষিদ্ধ বা সংরক্ষিত অঞ্চলে (Core Zone) মানুষের স্থায়ী বসবাস আইনিভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে এর সীমান্তবর্তী বাফার জোন এবং আশেপাশের উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে (যেমন: বাগেরহাটের মংলা, শরণখোলা; সাতক্ষীরার শ্যামনগর; খুলনার দাকোপ ও কয়রা) লক্ষ লক্ষ মানুষের বসবাস। এদের জীবন, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতি সরাসরি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। বনের ওপর ভিত্তি করে বেঁচে থাকা প্রধান পেশাজীবী গোষ্ঠীগুলো হলো:
বাওয়ালী (গোলপাতা সংগ্রাহক): এরা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বন বিভাগের অনুমতি (পাস) নিয়ে সুন্দরবনের গহীন অঞ্চলে প্রবেশ করেন। বুক সমান কাদা ও নোনা পানি মাড়িয়ে এরা গোলপাতা এবং গোলকাঠ সংগ্রহ করেন, যা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের ঘরের ছাউনি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
মৌয়াল (মধু সংগ্রাহক): সুন্দরবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হলো মধু সংগ্রহ। প্রতি বছর এপ্রিল-মে মাসে মৌয়ালরা দলবেঁধে বনের গভীরে যান। ঘন বনের ভেতর যেখানে বাঘের পায়ের চাপ টাটকা, সেখানে দাঁড়িয়ে কোনো আধুনিক সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই এরা মৌচাক থেকে খাঁটি মধু ও মোম সংগ্রহ করেন। মধু সংগ্রহের সময় প্রায়ই এদের বাঘ বা বিষাক্ত সাপের মুখোমুখি হয়ে প্রাণ হারাতে হয়।
জেলে ও কাঁকড়া শিকারী: সুন্দরবনের জালের মতো ছড়িয়ে থাকা হাজারো নদী ও খাঁড়িতে ঐতিহ্যবাহী উপায়ে নৌকা নিয়ে মাছ এবং কাঁকড়া ধরাই এদের প্রধান কাজ। বিষাক্ত জেলিফিশের আক্রমণ এবং জোয়ার-ভাটার তীব্র স্রোতের সাথে লড়াই করে এদের টিকে থাকতে হয়।
মুন্ডা আদিবাসী সম্প্রদায়: সুন্দরবনের সীমান্তবর্তী কিছু প্রান্তিক এলাকায় ‘মুন্ডা’ নামক একটি প্রাচীন আদিবাসী গোষ্ঠী বংশপরম্পরায় বাস করছে। তারা মূলত ব্রিটিশ আমলে জঙ্গল কাটার জন্য এখানে এসেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তারা এই বনেরই অংশ হয়ে যায়। তারা বনের নিজস্ব লোকজ ঐতিহ্য, বনবিবির পূজা এবং বন্যপ্রাণী সুরক্ষার সংস্কৃতিকে আজও টিকিয়ে রেখেছে।
সুন্দরবন বর্তমানে কী কী মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে?
পৃথিবীর এই অনন্য ও সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রটি বর্তমানে বেশ কিছু মারাত্মক মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা অবিলম্বে বন্ধ না হলে সুন্দরবন অচিরেই তার গৌরব হারাবে:
১. লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও ‘টপ ডাইং’ বা আগামরা রোগ: উজান থেকে আসা নদীগুলোর মিষ্টি পানির প্রবাহ ফারাক্কা ও অন্যান্য কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে সমুদ্রের নোনা পানি বনের ভেতরে বেশি প্রবেশ করছে। অতিরিক্ত লবণের কারণে সুন্দরবনের প্রধান ঐতিহ্য ‘সুন্দরী’ গাছের আগা উপর থেকে মরে শুকিয়ে যাচ্ছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা একে ‘টপ ডাইং’ বা আগামরা রোগ বলছেন, যা বনের প্রায় ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছকে গ্রাস করেছে।
২. মিষ্টি পানির সংকট ও বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে আগমন: ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসে বনের ভেতরের মিষ্টি পানির একমাত্র উৎস বা পুকুরগুলো নোনা পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে তীব্র তৃষ্ণায় এবং হরিণের মতো সহজ শিকারের সন্ধানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রায়ই নদী সাঁতরে লোকালয়ে চলে আসে। এতে একদিকে যেমন মানুষের গৃহপালিত পশু ও জীবনের ক্ষতি হয়, অন্যদিকে মানুষের পিটুনিতে বাঘ মারা পড়ার মতো ঘটনা ঘটে, যা মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাত বাড়িয়ে তুলছে।
৩. অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন ও জলজ দূষণ: পশুর নদী ও মংলা বন্দর সংলগ্ন সুন্দরবনের ঠিক বর্ডার এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন ভারী শিল্পকারখানা, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য বনের বাতাস ও পানিকে প্রতিনিয়ত দূষিত করছে। এর চেয়েও বড় বিপদের কারণ হলো, পশুর নদীতে প্রায়শই কয়লা, ফ্লাই অ্যাশ বা তেলবাহী কার্গো জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটে। এই তেল ও রাসায়নিক বনের শ্বাসমূল (Pneumatophores) ঢেকে দেয়, যার ফলে গাছপালা অক্সিজেন না পেয়ে মারা যায় এবং ডলফিনসহ জলজ প্রাণীদের প্রজনন ব্যাহত হয়।
৪. পর্যটন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের অভিশাপ: প্রতি বছর শীতকালে সুন্দরবনে লাখো পর্যটকের সমাগম ঘটে। পর্যটকবাহী বড় বড় লঞ্চের উচ্চ শব্দ বনের ভেতরের শান্ত পরিবেশ নষ্ট করে, ফলে বাঘ ও হরিণের মতো লাজুক প্রাণীরা বনের আরও গভীরে চলে যেতে বাধ্য হয়। এছাড়া অসচেতন পর্যটকদের ফেলে আসা ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক কাপ, প্লেট ও পানির বোতল বনের মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে।
ঢাকা থেকে সুন্দরবন যাওয়ার সবচেয়ে সহজ ও সম্পূর্ণ গাইডলাইন
যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়নের ফলে এখন ঢাকা থেকে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার খুলনা বা মংলায় পৌঁছানো আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ ও আরামদায়ক হয়েছে। আপনি আপনার বাজেট ও সুবিধা অনুযায়ী তিনভাবে যাতায়াত করতে পারেন:
১. ট্রেনের মাধ্যমে যাত্রা (সবচেয়ে আরামদায়ক ও নিরাপদ)
যারা দীর্ঘ যাত্রায় বাসের চেয়ে ট্রেনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাদের জন্য ঢাকার কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সরাসরি খুলনা যাওয়ার দুটি চমৎকার আন্তঃনগর ট্রেন রয়েছে।
সুন্দরবন এক্সপ্রেস (#৭২৬): এই ট্রেনটি ঢাকা থেকে সকাল ০৮:১৫ মিনিটে ছেড়ে যায় এবং খুলনা পৌঁছায় বিকেল ০৫:৪০ মিনিটে (সাপ্তাহিক বন্ধের দিন: বুধবার)।
চিত্রা এক্সপ্রেস (#৭৬৪): এটি ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ০৭:৩০ মিনিটে এবং খুলনা পৌঁছায় ভোর ০৫:০০ মিনিটে (সাপ্তাহিক বন্ধের দিন: রবিবার)।
ভাড়া ও বুকিং: ট্রেনের শোভন চেয়ার সাধারণত ৫০০ টাকা থেকে শুরু এবং এসি স্নিগ্ধা ও স্লিপার বার্থের ভাড়া ১,০০০ থেকে ২,২০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। খুলনা স্টেশনে নেমে আপনি খুব সহজেই লোকাল বাস, সিএনজি বা রিজার্ভ কারে করে মাত্র ১ ঘণ্টার মধ্যে মংলা ঘাটে পৌঁছে যেতে পারবেন।
২. বাসের মাধ্যমে যাত্রা (সবচেয়ে দ্রুত মাধ্যম)
ঐতিহাসিক পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা থেকে সরাসরি খুলনা বা মংলা যাওয়ার বাস যোগাযোগে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। ফেরিঘাটের সেই চিরচেনা জ্যাম এখন আর নেই। ঢাকার সায়েদাবাদ, গাবতলী বা আব্দুল্লাহপুর বাস টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন নামী কোম্পানির (যেমন: হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এনআর ট্রাভেলস, গ্রিন লাইন, সোহাগ, ইমাদ ট্রাভেলস) এসি ও নন-এসি বাস সরাসরি মংলা বা খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে এখন মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার মধ্যেই মংলায় পৌঁছানো সম্ভব। নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া ১,২০০ থেকে ১,৮০০ টাকার মধ্যে।
৩. আকাশপথে যাত্রা (সময় সাশ্রয়ী)
যদি আপনি খুব দ্রুত পৌঁছাতে চান, তবে ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডমেস্টিক ফ্লাইটে (ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার বা বিমান বাংলাদেশ) মাত্র ৪৫ মিনিটে যশোর বিমানবন্দরে পৌঁছাতে পারেন। যশোর বিমানবন্দর থেকে প্রাইভেট কার বা এসি বাসে করে খুলনা হয়ে ১ থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে সরাসরি মংলা চলে যাওয়া যায়।
সুন্দরবনের আসল ভ্রমণ (লঞ্চ বা বোট ট্রিপ): খুলনা বা মংলা ঘাটে পৌঁছানোর পর আপনার আসল সুন্দরবন যাত্রা শুরু হবে। সুন্দরবনের গভীরে কোনো রাস্তা বা হোটেল নেই, তাই আপনাকে লঞ্চ বা ক্রুজ শিপেই থাকতে হবে। আপনি বিভিন্ন রেজিস্টার্ড ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে ৩ দিন ২ রাতের ক্রুজ শিপ প্যাকেজ নিতে পারেন। এই ট্রিপে আপনাকে করমজল (বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র), হারবাড়িয়া (বাঘের পায়ের ছাপ দেখার জায়গা), কটকা অভয়ারণ্য, কচিখালী এবং সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন ডিমের চর ঘুরিয়ে দেখানো হবে।
সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের একটি দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্রই নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব ও জীবন বাঁচানোর এক পরম বন্ধু। সুন্দরবন ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। তাই সুন্দরবন ভ্রমণের সময় চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক বর্জ্য বনে না ফেলে এবং বনের ভেতরে উচ্চ শব্দে গান না বাজিয়ে আমাদের পরিবেশের প্রতি অত্যন্ত দায়িত্বশীল হতে হবে। আসুন, সুন্দরবনের এই আদিম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করি এবং একে পরম যত্নে টিকিয়ে রাখতে নিজেদের জায়গা থেকে সচেতন ভূমিকা পালন করি।