আজকের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক জীবনে কম-বেশি আমাদের সবাইকে নানা রকম দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে অনেক সময় কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই আমাদের মনে এক ধরণের অজানা ভয়, অস্থিরতা বা অহেতুক পেরেশানি ভর করে। এই ধরণের মানসিক অবসাদ মানুষের কর্মক্ষমতা ও মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়।
বিজ্ঞান যেখানে মানসিক চাপ কমাতে বিভিন্ন থেরাপি বা কাউন্সেলিংয়ের কথা বলে, ইসলাম সেখানে আমাদের দিয়েছে চমৎকার কিছু দোয়া ও আমল। পাবনা নিউজ ২৪-এর আজকের আয়োজনে আমরা জানবো অহেতুক পেরেশানি ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির কিছু শক্তিশালী দোয়া এবং এর ইসলামিক সমাধান।
অহেতুক পেরেশানি নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তবে শয়তান অনেক সময় মানুষের মনে অহেতুক কুচিন্তা (ওয়াসওয়াসা) এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত ভয় ঢুকিয়ে দেয়, যাতে মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:
“জেনে রেখো, আল্লাহর জিকির (স্মরণ) দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (সূরা আর-রাদ, আয়াত: ২৮)
তাই যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুশ্চিন্তা বা পেরেশানি দূর করতে আল্লাহর দরবারে হাত তোলার বিকল্প নেই।
অহেতুক পেরেশানি ও দুশ্চিন্তা মুক্তির সেরা দোয়াগুলো
রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে যখনই কোনো কঠিন পরিস্থিতি বা পেরেশানির সম্মুখীন হতেন, তখনই আল্লাহর দরবারে বিশেষ কিছু দোয়ার মাধ্যমে আশ্রয় চাইতেন। নিচে এমন কয়েকটি কার্যকরী দোয়া উল্লেখ করা হলো:
১. দুশ্চিন্তা ও ঋণমুক্তির বিশেষ দোয়া
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন এবং সাহাবিদেরও সকাল-সন্ধ্যায় এটি পড়ার নির্দেশ দিতেন:
{اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ}
- উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাজানি, ওয়াল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া দ্বালা’ইদ দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজাল।
- অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-কষ্ট থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের প্রাধান্য (জুলুম) থেকে। (সহীহ বুখারী)
২. মন শান্ত করার ও বিপদমুক্তির দোয়া (দোয়া ইউনুস)
যেকোনো কঠিন পেরেশানি বা বিপদের সময় ‘দোয়া ইউনুস’ পড়া অত্যন্ত ফলদায়ক। মহান আল্লাহ এই দোয়ার বরকতেই হযরত ইউনুস (আ.)-কে মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছিলেন।
{لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ}
- উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমিন।
- অর্থ: আপনি ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই, আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭)
৩. হঠাৎ বিপদে পড়ার ভয় ও অস্থিরতা দূর করার দোয়া
{حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ}
- উচ্চারণ: হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল।
- অর্থ: আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না চমৎকার কর্মবিধায়ক। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭৩)
দোয়া ছাড়াও মানসিক প্রশান্তি লাভের কিছু ইসলামিক আমল
শুধুমাত্র মুখে দোয়া পড়ার পাশাপাশি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি, যা মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে:
- পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েম করা: নামাজ মানুষের মনকে দুনিয়াবি সব কোলাহল থেকে মুক্ত করে আল্লাহর সাথে জুড়ে দেয়, যা মানসিক শান্তি পাওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম।
- বেশি বেশি ইস্তিগফার করা: হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি নিয়মিত ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়ে, আল্লাহ তাআলা তার সব কঠিন পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন এবং সব পেরেশানি দূর করে দেন।
- পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত: প্রতিদিন অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত করলে অন্তরের ভেতর এক অলৌকিক প্রশান্তি অনুভূত হয়।
- তাকদিরের ওপর বিশ্বাস রাখা: একজন মুমিন বিশ্বাস করে যে, তার জীবনে যা ঘটছে তা আল্লাহর হুকুমেই ঘটছে এবং এর পেছনে অবশ্যই কোনো না কোনো কল্যাণ লুকিয়ে আছে। এই বিশ্বাস মনের অর্ধেক কষ্ট দূর করে দেয়।
উপসংহার
অহেতুক পেরেশানি বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা শয়তানের একটি ফাঁদ, যা মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করতে চায়। তাই যখনই মনে অস্থিরতা কাজ করবে, অলস বসে না থেকে অজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে যান এবং উপরোক্ত দোয়াগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ডাক শোনেন।