Home লাইফস্টাইল আপনার কণ্ঠ আর আপনার চেহারা এখন অন্যের হাতের পুতুল! ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির এক অন্ধকার দিক

আপনার কণ্ঠ আর আপনার চেহারা এখন অন্যের হাতের পুতুল! ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির এক অন্ধকার দিক

0
আপনার কণ্ঠ আর আপনার চেহারা এখন অন্যের হাতের পুতুল! ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির এক অন্ধকার দিক
আপনার অজান্তেই কি আপনার চেহারা বা কণ্ঠস্বর অপরাধীদের হাতের পুতুলে পরিণত হচ্ছে? ইমো বা হোয়াটসঅ্যাপে পরিচিত মানুষের ভিডিও কল দেখে টাকা ধার দেওয়ার আগে এক সেকেন্ড থামুন! প্রযুক্তির ভয়ংকর ফাঁদ 'ডিপফেক' সম্পর্কে জানুন।

রিপোর্ট ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪:

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে যতটা সহজ করেছে, ঠিক ততটাই বাড়িয়েছে অদৃশ্য এক নিরাপত্তার ঝুঁকি। ধরুন, হঠাৎ আপনার ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারে আপনারই কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা আত্মীয়ের ভিডিও কল এলো। স্ক্রিনে তার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কণ্ঠস্বরও হুবহু এক। সে খুব বিপদে পড়েছে জানিয়ে আপনার কাছে জরুরি কিছু টাকা ধার চাইলো। আপনিও বিশ্বাস করে টাকা পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু পরে জানতে পারলেন, সেই মানুষটি আপনাকে কোনো কলই করেনি! আপনার সাথে যা ঘটেছে, তা কোনো জাদুটোনা নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর সবচেয়ে বিপজ্জনক অপব্যবহার, যার নাম ‘ডিপফেক’ (Deepfake)। আজ (২ জুলাই, ২০২৬) বিশ্বজুড়ে সাইবার অপরাধীদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এই প্রযুক্তি। আপনার অজান্তেই আপনার চেহারা আর কণ্ঠ এখন অপরাধীদের হাতের পুতুলে পরিণত হতে পারে। এই ভয়ংকর সাইবার ক্রাইম এবং তা থেকে বাঁচার উপায় নিয়ে আজ আমাদের এই বিশেষ সচেতনতামূলক গাইড।

‘ডিপ লার্নিং’ (Deep Learning) এবং ‘ফেক’ (Fake)—এই দুটি শব্দ মিলে তৈরি হয়েছে ‘ডিপফেক’। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন একটি প্রযুক্তি, যা ব্যবহার করে যেকোনো মানুষের ছবি, ভিডিও এবং কণ্ঠস্বরকে নিখুঁতভাবে নকল করে সম্পূর্ণ নতুন ও ভুয়া ভিডিও বা অডিও তৈরি করা যায়।

অপরাধীরা ইন্টারনেটে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকা আপনার মাত্র কয়েকটি ছবি বা কয়েক সেকেন্ডের ভয়েস রেকর্ড সংগ্রহ করে এআই অ্যালগরিদমে ইনপুট দেয়। এরপর এআই আপনার মুখের অভিব্যক্তি, চোখের পলক ফেলার ধরণ এবং কথা বলার স্টাইল হুবহু নকল করে এমন একটি ভিডিও বানিয়ে ফেলে, যা দেখে খালি চোখে বোঝার কোনো উপায় থাকে না যে এটি নকল।

আইডেন্টিটি থেফট বা পরিচয় চুরির ভয়ংকর রূপ

২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। অপরাধীরা এটিকে প্রধানত তিনভাবে ব্যবহার করে সাইবার ক্রাইম করছে:

১. আর্থিক প্রতারণা (Financial Fraud): পরিবারের সদস্য বা অফিসের বসের ভুয়া ভিডিও ও অডিও তৈরি করে জরুরি টাকা বা সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

২. ব্ল্যাকমেইলিং ও চরিত্র হনন: বিশেষ করে নারী ও তারকাদের সাধারণ ছবিকে ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে আপত্তিকর ভিডিওতে রূপান্তর করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে।

৩. রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গুজব: কোনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতার মুখে ভুয়া বক্তব্য বসিয়ে সমাজ বা রাষ্ট্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

আসল বসের আড়ালে নকলের ফাঁদ: সাধারণ মানুষ কীভাবে চিনবেন?

ডিপফেক ভিডিওগুলো দিন দিন এত নিখুঁত হচ্ছে যে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতারণা ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে সামান্য সচেতন হলে কিছু খুঁটিনাটি বিষয় খেয়াল করে আপনি নকল ভিডিও বা অডিও ধরে ফেলতে পারবেন:

চোখের পলক ও মুখের অমিল: ডিপফেক ভিডিওতে কৃত্রিম মানুষটির চোখের পলক ফেলার গতি অস্বাভাবিক হয়। অনেক সময় কথা বলার গতির সাথে তার ঠোঁট নাড়ার নিখুঁত মিল থাকে না।

অস্বাভাবিক ত্বক ও আলো-ছায়া: ভিডিওর ব্যক্তির মুখের ত্বক অতিরিক্ত মসৃণ বা ঝাপসা মনে হতে পারে। তার গলার চারপাশের আলো বা ছায়ার অবস্থান ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে মেলেনি বলে মনে হতে পারে।

কণ্ঠস্বরের রোবোটিক টোন: অডিও বা ভিডিও কলে কথা বলার সময় যদি কণ্ঠস্বর হুবহু মিলে গেলেও মাঝে মাঝে কোনো আবেগহীন রোবোটিক টোন বা যান্ত্রিক শব্দ পাওয়া যায়, তবে সাবধান হোন।

হঠাৎ ঝাপসা হয়ে যাওয়া: ভিডিওতে থাকা ব্যক্তি যদি মাথা দ্রুত এদিক-ওদিক ঘোরান, তবে খেয়াল করবেন কানের বা চুলের চারপাশটা মুহূর্তের জন্য একটু কাঁপছে বা ঝাপসা (Glitch) হয়ে যাচ্ছে কি না।

সাইবার নিরাপত্তা গাইড: কীভাবে সুরক্ষিত থাকবেন?

আপনার পরিচয় ও চেহারা যাতে ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপদ থাকে, সেজন্য সাইবার বিশেষজ্ঞরা কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন:

১. সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল লক রাখুন: ফেসবুকে বা ইনস্টাগ্রামে আপনার ছবি ও ভিডিও সবার জন্য উন্মুক্ত (Public) রাখবেন না। অপরিচিত কাউকে ফ্রেন্ড লিস্টে যুক্ত করা থেকে বিরত থাকুন।

২. জরুরি কোড বা ‘সেফ-ওয়ার্ড’ ব্যবহার করুন: পরিবারের ভেতরের সদস্যদের সাথে একটি গোপন কোড বা শব্দ নির্ধারণ করে রাখতে পারেন। কোনো জরুরি ভিডিও কলে টাকা চাইলে আগে সেই কোডটি জিজ্ঞেস করুন।

৩. সরাসরি ফোন কলে নিশ্চিত হোন: মেসেঞ্জার বা ইমোতে কোনো ভিডিও কল পেয়ে টাকা পাঠানোর আগে, ইন্টারনেটের বাইরে সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কে ফোন দিয়ে সরাসরি সেই ব্যক্তির সাথে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হোন।

৪. আইনি পদক্ষেপ: আপনি যদি কোনোভাবে ডিপফেকের শিকার হন, তবে ভয় না পেয়ে দ্রুত জাতীয় সাইবার সিকিউরিটি হেল্পলাইন (১৬৪৩০)-এ যোগাযোগ করুন অথবা নিকটস্থ থানায় অভিযোগ জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here