নিউজ ডেক্স: পাবনা নিউজ ২৪
০১ জুলাই, ২০২৬
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সূচকগুলোর দিকে তাকালে একটি মন খারাপ করা বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। উন্নত দেশ, এমনকি আমাদের অনেক প্রতিবেশী দেশের তুলনায়ও বাংলাদেশের মানুষের গড় স্বাস্থ্য ও জীবনীশক্তি অনেকটাই পিছিয়ে। সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে— আমরা কেন এত দ্রুত দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত হচ্ছি? কেন আমাদের গড় আয়ু ও কর্মক্ষমতা উন্নত বিশ্বের সমকক্ষ হচ্ছে না? অনেকেই এর জন্য কেবল ‘খাদ্যে ভেজাল’ বা ফরমালিন-কার্বাইডকে এককভাবে দায়ী করেন।
কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে ভেজাল তো মাত্র হিমশৈলের চূড়া (Tip of the iceberg); এর নিচে লুকিয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, চিকিৎসাব্যবস্থার পলিসি এবং পরিবেশগত আরও ৫টি মারাত্মক নীরব ঘাতক।
আজকের বিশেষ ফিচারে আমরা গভীর বিশ্লেষণসহ তুলে ধরব সেই কারণগুলো, যা বাংলাদেশকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ক্রমশ পিছিয়ে দিচ্ছে।
১. খাদ্যে ভেজাল ও পুষ্টিহীনতার দ্বিমুখী মার
নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত ভেজাল খাদ্য। মাছে-মাংসে বিষাক্ত রাসায়নিক, ফলে কার্বাইড, শুঁটকিতে ডিডিটি এবং সস্তা হোটেল-বেকারিতে টেক্সটাইল রঙের ব্যবহার মানুষের লিভার, কিডনি এবং পাকস্থলীকে ক্রমান্বয়ে অকেজো করে দিচ্ছে।
তবে এর চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো পুষ্টিহীনতা এবং ভুল খাদ্যাভ্যাস। আমাদের খাদ্য তালিকায় প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ ‘সুষম খাদ্য’-এর চেয়ে কার্বোহাইড্রেট বা ভাতের আধিক্য অনেক বেশি। অতিরিক্ত তেল, ডালডা এবং অতিরিক্ত মশলাযুক্ত ভাজাপোড়া খাওয়ার কারণে এ দেশের মানুষের শরীরে মেদ জমছে দ্রুত। ফলে উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure), টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং ফ্যাটি লিভারের মতো সমস্যা এখন ঘরে ঘরে মহামারি আকার ধারণ করেছে।
২. বায়ু ও পরিবেশ দূষণ: বাতাসের বদলে আমরা কি বিষ নিচ্ছি?
উন্নত দেশগুলোর দীর্ঘায়ুর অন্যতম গোপন রহস্য তাদের পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও বিশুদ্ধ বাতাস। আর আমাদের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বায়ুমান সূচক (AQI) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য শিল্পাঞ্চলগুলো প্রায়শই বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় থাকে। ইটের ভাটা, অপরিকল্পিত কনস্ট্রাকশন এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ির ধোঁয়া বাতাসকে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত করছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞান কী বলছে?
বিষাক্ত বায়ুর পিএম ২.৫ (PM2.5) কণা সরাসরি আমাদের ফুসফুস ও রক্তনালীতে প্রবেশ করছে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশে শ্বাসকষ্ট, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস এবং অকাল স্ট্রোকের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। পরিবেশ দূষণ কেবল ফুসফুস নয়, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
৩. ‘সেলফ-মেডিকেশন’ এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ভয়াল থাবা
উন্নত দেশে রেজিস্টার্ড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া একটি সাধারণ ওষুধও ফার্মেসি থেকে কেনা অসম্ভব। আর বাংলাদেশে সামান্য সর্দি-কাশি বা গা-ব্যথা হলেই মানুষ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজের ইচ্ছামতো ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা কড়া ব্যথানাশক (Painkiller) ওষুধ কিনে সেবন করেন, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘সেলফ-মেডিকেশন’ বলে।
এই মারাত্মক অভ্যাসের কারণে আমাদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ, ভুল নিয়মে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার ফলে জীবাণুগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং পরবর্তীতে সাধারণ কোনো ইনফেকশনেও মূল ধারার ওষুধ আর কাজ করছে না। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, এই নীরব মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী দিনে সাধারণ রোগেই বহু মানুষ মৃত্যুর মুখে ঢেলে পড়বে।
৪. কায়িক শ্রমের অভাব ও নিষ্ক্রিয় জীবনযাত্রা (Sedentary Lifestyle)
উন্নত দেশের নাগরিকেরা শত ব্যস্ততার মাঝেও হাঁটাচলা, সাইকেলিং কিংবা নিয়মিত শরীরচর্চার জন্য সময় বরাদ্দ রাখেন। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রা দিন দিন প্রযুক্তিনির্ভর ও অলস হয়ে পড়ছে। শহরাঞ্চলে খেলার মাঠ বা নিরাপদ ফুটপাথের অভাব এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে যান্ত্রিকীকরণের ফলে মানুষের শারীরিক পরিশ্রম আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা বা ডেস্কে কাজ করার কারণে বিপাকীয় প্রক্রিয়া (Metabolism) ধীর হয়ে যায়, যা অকাল হৃদরোগ (Heart Attack) এবং কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৫. চিকিৎসার চড়া ব্যক্তিগত খরচ (Out-of-Pocket Expenditure)
স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো আমাদের চিকিৎসা কাঠামোর ব্যয়ভার। উন্নত দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বীমা (Health Insurance) বা নিখরচায় চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু সরকারি বিভিন্ন তথ্য ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশে একজন রোগীর চিকিৎসার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ খরচ রোগীকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়।
ফলাফলস্বরূপ, মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের কেউ বড় কোনো রোগে (যেমন: ক্যানসার বা কিডনি ডায়ালাইসিস) আক্রান্ত হলে পুরো পরিবারটি অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। খরচের ভয়ে অনেকেই প্রাথমিক অবস্থায় রোগ লুকিয়ে রাখেন, যা পরবর্তীতে নিরাময়ের অযোগ্য হয়ে ওঠে।
৬. মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবহেলা ও সামাজিক ট্যাবূ
শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যও যে মানুষের দীর্ঘায়ু ও সুস্থতার জন্য অপরিহার্য, তা আমাদের সমাজে এখনও স্বীকৃতি পায়নি। ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি বা অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপকে আমাদের দেশে ‘পাগলামি’ বা সামাজিক লজ্জা হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিক অবসাদ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) কমিয়ে দেয় এবং ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতার জন্ম দেয়।
উন্নত দেশের সমকক্ষ হতে হলে শুধু জিডিপি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ালেই চলবে না, নাগরিকদের সুস্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে। খাদ্যে ভেজাল রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্তরে আমাদের সচেতন হতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনের অভ্যাস ত্যাগ করা, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটাচলা করা, খাবারে শর্করার পরিমাণ কমিয়ে শাকসবজি বাড়ানো এবং পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হওয়াই পারে আমাদের জীবনীশক্তিকে উন্নত দেশের পর্যায়ে নিয়ে যেতে।