নিউজ ডেস্ক || পাবনা নিউজ ২৪
২৯ জুন, ২০২৬
চলতি ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে এসে তীব্র গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে সারা দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে লোডশেডিং। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন ও শিল্পোৎপাদন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এই তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এর আসল কারণ নিশ্চিত করেছেন খোদ সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।
জ্বালানি মন্ত্রী সংসদে সাফ জানিয়েছেন যে, দেশের দুটি প্রধান ও বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে দেশব্যাপী এই ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের সৃষ্টি হয়েছে। নিচে এই সংকটের সময়কাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের নেপথ্য কারণ, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং উত্তরণের উপায় নিয়ে একটি বিস্তারিত ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
সংসদে জ্বালানি মন্ত্রীর বক্তব্য ও সংকটের মূল কারণ
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের একটি প্রশ্নোত্তর পর্বে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতির গ্রাফচিত্র তুলে ধরেন। তিনি স্বীকার করেন যে, জুনের শুরু থেকেই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে এক বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রী সংসদে নিশ্চিত করেন, দেশের দুটি মেগা পাওয়ার প্ল্যান্ট বা প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্র—যার ওপর দেশের বড় অংশের বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্ভর করে, সেগুলো বর্তমানে যান্ত্রিক ত্রুটি এবং কাঁচামাল (জ্বালানি) সংকটের কারণে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এই দুটি কেন্দ্র থেকে দৈনিক প্রায় ১৫০০ থেকে ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ উৎপাদন শূন্যে নেমে আসায় দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে বাধ্য হয়েই বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
যদিও সংসদে কৌশলগত কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটির নাম সরাসরি বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবে বিদ্যুৎ বিভাগের অভ্যন্তরীণ ডেটা এবং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই মেগা প্রজেক্টগুলোর বন্ধ হওয়ার পেছনে মূল দায়ী ‘জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হওয়া’।
প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বর্তমান অবস্থা (জুন ২০২৬):
পায়রা বা রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র (কয়লা সংকট): ডলার সংকটের কারণে সময়মতো কয়লা আমদানি করতে না পারায় এই বড় কেন্দ্রটির একটি ইউনিট সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়েছে। কয়লার অভাবে গত কয়েক সপ্তাহে এই কেন্দ্রের উৎপাদন প্রায় ৫0% কমে গেছে।
মহেশখালী/এলএনজি টার্মিনাল জটিলতা: তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সরবরাহে যান্ত্রিক ত্রুটি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট মার্কেট থেকে চড়া মূল্যে গ্যাস কিনতে না পারার কারণে দেশের কয়েকটি গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছে না। ফলে গ্যাস সংকটে আরেকটি মেগা প্ল্যান্ট পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
উৎপাদন বনাম চাহিদা (জুন ২০২৬): চলতি জুন মাসে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা রেকর্ড করা হয়েছে প্রায় ১৬,৫০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৩,০০০ থেকে ১৩,৫০০ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে, যা লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করা হচ্ছে।
৩. অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব
বিদ্যুৎ খাতের এই অস্থিতিশীলতা কেবল জনজীবনকেই অতিষ্ঠ করেনি, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে এক বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
শিল্পোৎপাদন ও গার্মেন্টস খাতে ধস
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক (RMG) খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME)। দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে শিল্প মালিকদের চড়া মূল্যে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন খরচ (Cost of Production) প্রায় ৩০% বেড়ে গেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা কমছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি খাতে স্থবিরতা
জুন-জুলাই মাস হলো আমন চাষের মৌসুম। দেশের উত্তরবঙ্গ বিশেষ করে পাবনা, বগুড়া ও রাজশাহীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সেচ পাম্পগুলো বিদ্যুতের অভাবে ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। এর ফলে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে, যা আগামীতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। এছাড়া শহরের শপিং মল ও কাঁচাবাজারগুলোতেও লোডশেডিংয়ের কারণে বেচাকেনা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
কেন কাটছে না এই বিদ্যুৎ সংকট?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের পেছনে কেবল কারিগরি ত্রুটি দায়ী নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত কিছু ভুল সিদ্ধান্ত এবং আইনি দুর্বলতা দায়ী:
১. আমদানি নির্ভরতা: দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত জোর না দিয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় বিদেশি এলএনজি এবং কয়লার ওপর নির্ভর করার খেসারত দিচ্ছে দেশ।
২. ডলার ও রিজার্ভ সংকট: আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি কেনার জন্য যে পরিমাণ ডলারের প্রয়োজন, তা সময়মতো ব্যাংকগুলো সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে আমদানিকারকরা এলসি (LC) খুলতে পারছেন না।
৩. ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা: অলস বসে থাকা রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দিতে হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ খাতের বাজেটকে ফাঁকা করে দিচ্ছে।
সংকট উত্তরণে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা
সংসদে দাঁড়িয়ে জ্বালানি মন্ত্রী কেবল সমস্যার কথাই বলেননি, বরং এই সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণের কিছু আশু পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন:
জরুরি এলসি অনুমোদন: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে সমন্বয় করে আগামী সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানি আমদানির জন্য জরুরি ভিত্তিতে ডলার বরাদ্দ দেওয়া হবে।
বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ: পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ সাময়িকভাবে বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
মেরামত কাজ দ্রুত সম্পন্নকরণ: বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি সারাতে বিদেশি প্রকৌশলীরা দিনরাত কাজ করছেন এবং আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে একটি ইউনিট চালু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোর মূল ভিত্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। সংসদে জ্বালানি মন্ত্রীর দেওয়া এই তথ্য প্রমাণ করে যে, দেশের বিদ্যুৎ খাত এক গভীর কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে কিংবা শুধু আশ্বাস দিয়ে এই লোডশেডিংয়ের সমাধান সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট কাটাতে হলে দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি, রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের চুক্তি বাতিল এবং নবায়নযোগ্য শক্তির (Solar and Wind Power) ব্যবহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায়, ২০২৬ সালের এই তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেশের অর্থনীতির চাকাকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিতে পারে।