পৃথিবীতে যতগুলো প্রধান ধর্ম রয়েছে—ইসলাম, সনাতন (হিন্দু), বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সব ধর্মেরই মূল ভিত্তি এবং অন্তর্নিহিত বাণী হলো শান্তি, পরমতসহিষ্ণুতা এবং মানবকল্যাণ। ধর্ম মানুষকে সৎ পথে চলতে শেখায়, নৈতিকতার শিক্ষা দেয় এবং একে অপরের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগায়। কিন্তু বর্তমান যুগে অনেক সময়ই ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান কিংবা ভুল ব্যাখ্যার কারণে মানুষের মধ্যে দূরত্ব ও বিভেদ তৈরি হতে দেখা যায়। অথচ, ধর্ম ও মানবতার আসল সম্পর্কটি বিভেদের নয়, বরং পরম ভালোবাসা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির।
ধর্মের মূল সুর: মানবসেবা
সব ধর্মই একবাক্যে স্বীকার করে যে, সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকে ভালোবাসা এবং মানুষের সেবা করার মাধ্যমেই পরমেশ্বরের সন্তুষ্টি লাভ সম্ভব।
ইসলাম ধর্মে: পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি একজন মানুষকে হত্যা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে একজন মানুষের প্রাণ বাঁচালো, সে যেন পুরো মানবজাতির প্রাণ বাঁচালো।” বিদায় হজের ভাষণে মহানবী (সা.) জাতি-ধর্ম-বর্ণের বৈষম্য দূর করে মানবতার সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
সনাতন ধর্মে: স্বামী বিবেকানন্দের সেই বিখ্যাত বাণী—”জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”—আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবের সেবা করাই আসল ধর্ম। মহাভারতেও বলা হয়েছে, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।”
বৌদ্ধ ধর্মে: অহিংসা ও জীবপ্রেমই বৌদ্ধ ধর্মের মূল কথা। গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা হলো, “জগতে শত্রুতার দ্বারা কখনো শত্রুতার উপশম হয় না, অবৈরিতার (মৈত্রী) দ্বারাই শত্রুতার উপশম হয়।”
খ্রিস্টান ধর্মে: যীশু খ্রিষ্টের প্রধান শিক্ষাই ছিল প্রেম এবং ক্ষমা। তিনি বলেছিলেন, “তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসো।”
মানবতা যেখানে ধর্মের ঊর্ধ্বে
যখন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি বা বড় কোনো বিপর্যয় আসে, তখন কিন্তু মানুষের রক্ত বা কান্নার কোনো আলাদা ধর্ম থাকে না। বন্যার পানিতে যখন ঘরবাড়ি ভেসে যায় কিংবা ভূমিকম্পে যখন মানুষ ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে, তখন একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে বাঁচাতে ছুটে যায়—সেখানে পরিচয় কেবলই তারা ‘মানুষ’। ক্ষুধা, দারিদ্র্য বা কষ্টের কোনো জাত নেই। তাই যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন আসে, সেখানে মানবতাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় ধর্ম।
সম্প্রীতির সমাজ গঠনে আমাদের করণীয়
বর্তমান বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে ধর্মীয় উগ্রতা ও সংকীর্ণতা পরিহার করে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। এর জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
১. পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা: নিজের ধর্মকে ভালোবাসার পাশাপাশি অন্যের ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা প্রদর্শন করতে হবে।
২. ভুল তথ্য ও গুজব প্রতিরোধ: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ধর্মীয় উস্কানিমূলক বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখলে যাচাই না করে তা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩. সামাজিক মেলবন্ধন: বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব-পার্বণে একে অপরের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার সংস্কৃতি বজায় রাখতে হবে।
শেষ কথা
ধর্ম মানুষকে জুড়তে শেখায়, ভাঙতে নয়। আজ যদি আমরা ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে তার ভেতরের মানবিক মূল্যবোধ ও ভালোবাসার শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারি, তবেই সমাজ থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও হানাহানি দূর হবে। আসুন, ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে প্রথমে একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠি এবং ভালোবাসার মাধ্যমে একটি সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলি।