নিউজ ডেস্ক: পাবনা নিউজ ২৪
একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো তার জনসংখ্যা। বিশ্ব অর্থনীতিতে অনেক দেশই তাদের বিশাল জনসংখ্যাকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ হিসেবে ব্যবহার করে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। চীন, ভারত কিংবা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের বিশাল জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে (Manpower) রূপান্তর করে আজ বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিপরীতে, বাংলাদেশ প্রায় ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের এক বিশাল জনসমুদ্র নিয়ে বহুল কাঙ্ক্ষিত সেই অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত রূপান্তর ঘটাতে হিমশিম খাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে রয়েছে এবং কেন আমরা আমাদের এই বিশাল জনসংখ্যাকে কার্যকর জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারছি না—তা আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো।
শিক্ষাব্যবস্থার সনাতন পদ্ধতি ও প্রায়োগিক দক্ষতার অভাব
আমাদের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারার সবচেয়ে বড় কারণ হলো আমাদের ত্রুটিপূর্ণ ও কর্মমুখীহীন শিক্ষাব্যবস্থা। প্রতি বছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো থেকে লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, কিন্তু তাদের সিংহভাগই আধুনিক বৈশ্বিক বাজারের জন্য উপযুক্ত নয়।
থিওরি-নির্ভর শিক্ষা: বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মুখস্থ বিদ্যা এবং তাত্ত্বিক (Theoretical) বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে প্রাথমিক স্তর থেকেই কোডিং, রোবোটিক্স, অ্যানালিটিক্যাল থিংকিং এবং কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক, সেখানে আমাদের দেশে সাধারণ বা সাধারণ শিক্ষার হার বেশি।
স্কিল গ্যাপ বা দক্ষতার ঘাটতি: বর্তমান ২০২৬ সালের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (4IR) যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা সায়েন্স, আইওটি (IoT) এবং অ্যাডভান্সড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যে চাহিদা, তার সাথে আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কারিকুলামের বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। ফলস্বরূপ, দেশে লাখ লাখ সার্টিফিকেটধারী বেকার তৈরি হচ্ছে, যাদের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি থাকলেও কোনো সুনির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা নেই।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
উন্নত বিশ্বে কারিগরি শিক্ষা বা ভোকেশনাল ট্রেনিংকে অত্যন্ত মর্যাদার চোখ দেখা হয়। জার্মানি বা জাপানের মতো দেশে বড় একটা অংশ শিক্ষার্থী হাই স্কুলের পর সরাসরি কারিগরি লাইনে চলে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে পরিস্থিতি একদম ভিন্ন।আমাদের সমাজে এখনো কারিগরি, ডিপ্লোমা বা বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে ‘কম মেধাবীদের’ রাস্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সামাজিক ট্যাবু বা মানসিকতার কারণে তরুণেরা কোনো কারিগরি দক্ষতা অর্জন না করে কেবল একটি সাধারণ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পেছনে ছুটছে। অথচ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ বা এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতে সাধারণ ডিগ্রিধারীদের চেয়ে দক্ষ প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, নার্স বা আইটি টেকনিশিয়ানদের চাহিদা এবং বেতন অনেক বেশি। সঠিক দিকনির্দেশনা ও সামাজিক স্বীকৃতির অভাবে তরুণ সমাজ এই বিশাল কর্মসংস্থানের বাজার হারাচ্ছে।
মান্ধাতা আমলের প্রবাসী শ্রমিক ও রেমিট্যান্সের গুণগত মান
বাংলাদেশ প্রতি বছর লাখ লাখ শ্রমিক বিদেশে পাঠায় এবং তারা দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের চাকা সচল রাখছেন। কিন্তু এই জনশক্তি রপ্তানির ভেতরে এক বড় ধরনের দুর্বলতা লুকিয়ে আছে।
অদক্ষ শ্রমিকের আধিপত্য: বাংলাদেশ থেকে যারা মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন, তাদের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই ‘অদক্ষ শ্রমিক’ (Unskilled Laborer)। তারা সেখানে গিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নির্মাণ শ্রমিক বা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন।
আয়ের বিশাল পার্থক্য: একজন অদক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিক যেখানে মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন, সেখানে ভারত, শ্রীলঙ্কা বা ফিলিপাইনের একজন আইটি এক্সপার্ট, নার্স বা ইঞ্জিনিয়ার সমপরিমাণ সময়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা আয় করেন। আমরা আমাদের জনসংখ্যাকে বিদেশে পাঠাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তাদের ‘দক্ষ জনশক্তি’ হিসেবে তৈরি করে পাঠাতে পারছি না। ফলে সংখ্যার দিক থেকে বেশি হলেও আয়ের দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ছি।
প্রাতিষ্ঠানিক ও গবেষণা তহবিলের তীব্র সংকট
উন্নত দেশগুলো তাদের মোট জিডিপির (GDP) একটা বড় অংশ ব্যয় করে শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং গবেষণা ও উদ্ভাবন (R&D) খাতে। অন্যদিকে বাংলাদেশে এই খাতে বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেই অন্যতম সর্বনিম্ন। নতুন কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবন বা আন্তর্জাতিক মানের ট্রেনিং সেন্টারের অভাব রয়েছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে। সরকারিভাবে যেসব ড্রাইভিং বা কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেগুলোর অধিকাংশেরই মান আধুনিক আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নীতি নির্ধারণের দুর্বলতা ও কর্মসংস্থানের অভাব
দেশে যুবকদের দক্ষ করার পাশাপাশি সেই দক্ষতাকে কাজে লাগানোর মতো পর্যাপ্ত শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যাচ্ছে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক অনগ্রসরতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ঘাটতির কারণে নতুন নতুন উদ্যোক্তা বা স্টার্টআপ তৈরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে আইটি খাতের প্রসার ঘটলেও তা বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। ফলস্বরূপ, যোগ্য ও দক্ষ অনেক তরুণ শেষ পর্যন্ত ‘ব্রেন ড্রেন’ (Brain Drain) বা মেধা পাচারের শিকার হয়ে উন্নত দেশে চলে যাচ্ছে, যার সুবিধা পাচ্ছে অন্য দেশগুলো।
উত্তরণের উপায়: কীভাবে মিলবে মুক্তি?
কারিকুলামের আধুনিকায়ন: শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে কর্মমুখী ও প্রাকটিক্যাল-নির্ভর করতে হবে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির চেয়ে ‘শর্ট-টার্ম স্কিল কোর্স’ বা দক্ষতাভিত্তিক সার্টিফিকেটকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
মেগা কারিগরি ইনস্টিটিউট: দেশের প্রতিটি জেলায় আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, যেখানে বিভিন্ন ভাষার কোর্স, আইটি স্কিল এবং গ্লোবাল ড্রাইভিং ও নার্সিংয়ের মতো পেশার মানসম্মত ট্রেনিং দেওয়া হবে।
সামাজিক সচেতনতা: কারিগরি ও ফ্রিল্যান্সিং পেশাকে খাটো করে দেখার মানসিকতা দূর করতে সরকারি ও বেসরকারি স্তরে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।
সমাপনী ভাবনা
জনসংখ্যা কখনোই একটি দেশের জন্য অভিশাপ বা বোঝা নয়, যদি তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়। ২০২৬ সালের এই প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে অতি দ্রুত তার সস্তা শ্রমের (Cheap Labor) ট্যাগ লাইন থেকে বেরিয়ে এসে ‘মেধানির্ভর ও দক্ষ জনশক্তি’ (Skilled Manpower) তৈরিতে পূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে। তবেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের আসল সুবিধা ভোগ করে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছানো সম্ভব হবে।