নিউজ ডেস্ক ,পাবনা নিউজ ২৪
মাঝরাতে যখন পুরো নিঝুম চর ঘুমিয়ে কাদা, ঠিক তখনই হঠাৎ মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ল উঠোনের কোণের বিশাল আম গাছটি। চোখের পলকে ঘরের দাওয়ায় এসে আছড়ে পড়ল পদ্মার রাক্ষুসে ঢেউ। ছাদেক আলী (৫৫) নিজের পরনের লুঙ্গিটা শক্ত করে বেঁধে কোনোমতে স্ত্রী আর দুই সন্তানকে টেনে তুললেন। গোয়ালঘরের গরুটা মুক্ত করার সময়টুকুও দেয়নি নদী। আধঘণ্টার মধ্যে ছাদেক আলীর তিন প্রকাশের ভিটেমাটি, ধানের গোলা আর সাজানো সংসার গিলে নিল সর্বনাশা পদ্মা। সকালে যেখানে ছিল এক চিলতে সবুজ গ্রাম, দুপুরে সেখানে শুধুই ধু-ধু জলরাশি।এটি কেবল কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং পাবনার ঈশ্বরদী, সুজানগর ও বেড়া উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী চরাঞ্চলের হাজারো ছাদেক আলীদের জীবনের নির্মম বাস্তবতার এক খতিয়ান। প্রতি বছর বর্ষা আসে, কিন্তু চরের মানুষের কাছে তা আশীর্বাদ নয়, বরং এক আতঙ্কের নাম। কেবল “নদী ভাঙছে” বা “এত হেক্টর জমি বিলীন”—এই শুকনো পরিসংখ্যানের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় একেকটি পরিবারের আজীবন কেঁদে বেড়ানোর গল্প।পাবনা জেলা ও এর আশপাশের চরাঞ্চল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত কয়েক দশকে সর্বনাশা পদ্মার করাল গ্রাসে হাজার হাজার পরিবার তাদের বাস্তুভিটা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বেসরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, শুধুমাত্র পাবনার সুজানগর, ঈশ্বরদী এবং বেড়া উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী চরাঞ্চলেই এ পর্যন্ত প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার পরিবার সরাসরি নদী ভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোত পরিবর্তনের সাথে সাথে গড়ে ৩০০ থেকে ৫০০টি নতুন পরিবার তাদের ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি হারায়। ভাঙনের এই তীব্রতায় চরের পর চর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় এই বিশাল সংখ্যক পরিবার রাতারাতি তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিচয় হারিয়ে ভাসমান বা ছিন্নমূল মানুষে পরিণত হয়েছে, যা এই অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদে এক স্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে।
অতীত স্মৃতি: যেখানে ছিল সোনার সংসার
পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতপুকুরিয়া চরের বাসিন্দা মরিয়ম বেগমের (৪৫) সাথে কথা হচ্ছিল অস্থায়ী বেড়িবাঁধের ওপর খড়ের ছাউনি দেওয়া এক ঝুপড়ি ঘরে। ভাঙনের শিকার হওয়া এই নারীর চোখে তখনো জলছাপ। তিনি তার অতীত স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বলছিলেন, “পদ্মার চরে আমাদের ঘরটা যখন আছিল, তখন বারান্দায় বইসা নদীর বাতাস খাইতাম। গোয়ালের গরু, মাঠের তরতাজা পটল আর ধান দিয়ে আমাদের অভাব কাকে বলে তা জানা ছিল না। আজ নদী আমাদের ফকির বানায়া দিছে।নদী ভাঙন কেবল মানুষের ঘরবাড়িই কেড়ে নেয় না, এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, একজন মানুষ যখন বারবার তার ঠিকানা হারায়, তখন তার মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী অনিশ্চয়তা ও মানসিক ট্রমা তৈরি হয়।পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর সংলগ্ন চরের বাসিন্দা প্রবীণ রহমত উল্লাহ (৭০) জানান, তিনি তার জীবনে মোট ৭ বার ঘর ভেঙেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “নদী যখন প্রথমবার ঘর ভাঙল, তখন খুব কাঁদছিলাম। এখন আর কান্না আসে না বাবা। শরীরটাও আর সয় না। বারবার ঘর বাঁধা আর ভাঙার এই খেলায় আমরা ক্লান্ত।” রহমত উল্লাহর মতো চরের প্রবীণদের দীর্ঘশ্বাস আজ পদ্মার বাতাসের সাথে মিশে হাহাকার তৈরি করছে।
স্থায়ী সমাধানের দাবি: ত্রাণ নয়, টেকসই বাঁধ চাই
চরাঞ্চলের মানুষের সাথে কথা বলে একটি বিষয় পরিষ্কার বোঝা যায়, তারা সরকারের কাছ থেকে ৫ কেজি চাল বা ২ কেজি ডালের সাময়িক ত্রাণ চান না। তাদের একমাত্র এবং প্রধান দাবি—নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ।পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রতি বছরই ভাঙন কবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেললেও চরের মানুষের মতে, এই অস্থায়ী ব্যবস্থা স্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারছে না। শুষ্ক মৌসুমে যদি নদী ড্রেজিং বা খনন করা না হয় এবং স্থায়ী নদী শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা না যায়, তবে প্রতি বছরই পাবনার মানচিত্র থেকে একেকটি ঐতিহ্যবাহী চর হারিয়ে যাবে।
কেন সরকার স্থায়ী পদক্ষেপ নিতে পারছে না? আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতা
নদী ভাঙনের পর প্রতি বছরই কোটি কোটি টাকার বাজেট বা সরকারি বরাদ্দের কথা শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবের চিত্র বদলায় না। এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা:
ভৌগোলিক ও টেকনিক্যাল সীমাবদ্ধতা: বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ অঞ্চল। বর্ষাকালে উজান থেকে আসা পানির গতিপথ এবং মাটির গঠন এতটাই পরিবর্তনশীল যে, প্রথাগত বাঁধ দিয়ে পদ্মার তীব্র স্রোত আটকে রাখা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
দীর্ঘমেয়াদী ড্রেজিংয়ের অভাব: নদী শাসনের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত নদী ড্রেজিং বা তলদেশ খনন করা। কিন্তু বিপুল পরিমাণ অর্থ সংকট এবং উন্নত প্রযুক্তির অভাবের কারণে সরকার শুধু বর্ষার সময় জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক জোড়াতালি দেওয়ার চেষ্টা করে, যা স্থায়ী কোনো ফল আনে না।
দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: স্থানীয় পর্যায়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অনেক প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ হলেও সঠিক সময়ে কাজ শেষ না হওয়া এবং নিম্নমানের সিসি ব্লক ব্যবহারের কারণে প্রথম বন্যার ধাক্কাতেই বাঁধ ধসে যায়।
যারা পাশে দাঁড়িয়েছে: সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার খতিয়ান
একেবারে যে কেউ পাশে দাঁড়ায়নি, তা নয়। দুর্যোগের এই দিনে বিভিন্ন সংস্থা চরের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে এগিয়ে এসেছে:
সরকারি ত্রাণ ও পুনর্বাসন: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বন্যা কবলিত পরিবারগুলোকে প্রতি বছরই চাল, ডাল এবং শুকনো খাবার দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে অনেক ভূমিহীন পরিবারকে ঘর বা গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
এনজিও (NGO) ও দাতা সংস্থা: ব্র্যাক (BRAC), কারিতাস, এবং আশা-র মতো বড় বড় বেসরকারি সংস্থা চরের মানুষদের জন্য আপদকালীন ঋণ, বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং বিনামূল্যে ল্যাট্রিন স্থাপন করে দিচ্ছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষ: পাবনার স্থানীয় তরুণদের বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নদী ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোকে ঘর স্থানান্তরে সাহায্য করে এবং ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অর্থ সাহায্য পৌঁছে দেয়।
নদী ভাঙনের কারণে দেশ যেভাবে পিছিয়ে পড়ছে
একটি নদীর ভাঙন শুধু একটি অঞ্চলের ক্ষতি করে না, এটি পুরো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে পেছনের দিকে টেনে ধরে:
উদ্বাস্তু সমস্যা ও বস্তির বিস্তার: নদী ভাঙনে নিঃস্ব হওয়া হাজার হাজার পরিবার প্রতি বছর গ্রাম ছেড়ে ঢাকা, রাজশাহী বা পাবনা জেলা শহরে চলে আসছে। এর ফলে শহরগুলোতে বস্তির সংখ্যা বাড়ছে, তৈরি হচ্ছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর আঘাত: চরের বিস্তীর্ণ উর্বর জমিতে প্রচুর পটল, পেঁয়াজ, মরিচ ও ধান চাষ হতো। নদী ভাঙনের ফলে এই ফসলি জমিগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহের ওপর।
দারিদ্র্য বিমোচনে বাধা: সরকার যখন বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্র্যের হার কমানোর চেষ্টা করছে, নদী ভাঙন ঠিক তখনই প্রতি বছর লাখ লাখ স্বাবলম্বী মানুষকে রাতারাতি দারিদ্র্যসীমার নিচে নামিয়ে দিচ্ছে।
সাধারণ মানুষের করণীয়: যেভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে
ত্রাণ বা সরকারি সাহায্যের আশায় শুধু বসে না থেকে চরের বাসিন্দাদের নিজেদেরও কিছু সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
প্রকৃতিবান্ধব বাঁধ তৈরি: চরের ঢালু জমিতে এবং নদীর পাড়ে প্রচুর পরিমাণে বাঁশ, ছন ও গভীর মূলের গাছ (যেমন: শিমুল, কদম বা পিটালী) রোপণ করতে হবে। এগুলো মাটির ক্ষয়রোধে প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে কাজ করে।
সামাজিক প্রতিরোধ ও নজরদারি: পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজের গুণগত মান কেমন হচ্ছে, তা স্থানীয় যুবসমাজকে তদারকি করতে হবে। কোনো দুর্নীতি বা নিম্নমানের কাজ দেখলে সাথে সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে তা তুলে ধরতে হবে।
সমন্বিত সমবায় ব্যবস্থা: চরের মানুষরা মিলে ছোট ছোট সমবায় সমিতি গড়ে তুলতে পারেন, যাতে আকস্মিক দুর্যোগে ঘর স্থানান্তরের জন্য আপদকালীন ফান্ড নিজেদের হাতেনাতেই থাকে।
পদ্মার বুকে বিলীন হওয়া চর” আসলে শুধু মাটির ক্ষয় নয়, এটি হাজারো মানবিক স্বপ্নের অপমৃত্যু। তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও চরের মানুষের লড়াকু মানসিকতা আমাদের আশাবাদী করে তোলে। নদী তাদের ঘর কাড়তে পারলেও তাদের ভেতরের অদম্য জীবনশক্তি কাড়তে পারেনি। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যদি এই সমস্ত নদীভাঙা মানুষের পুনর্বাসন এবং তাদের কর্মসংস্থানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া যায়, তবে এই মানুষগুলো দেশের অর্থনীতিতে আবারও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। পদ্মার জল গড়িয়ে যাবে, কিন্তু চরের মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর এই গল্পগুলো মানব ইতিহাসের পাতায় টিকে থাকবে এক অনন্য দলিল হিসেবে।