পাবনা নিউজ ২৪ আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা মার্কিন একক আধিপত্যের যে ‘দাবার ছক’ ওয়াশিংটন সাজিয়েছিল, তা এখন চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আমেরিকান-ইসরায়েলি অক্ষের সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশল এই অঞ্চলে সম্পূর্ণ নতুন এক সংকটের জন্ম দিয়েছে। যেসব উপসাগরীয় দেশ এতকাল মার্কিন নিরাপত্তার ছত্রচ্ছায়ায় নিজেদের নিরাপদ মনে করত, তারা এখন নিজেদের আরও বেশি অরক্ষিত ও ঝুঁকির মুখে আবিষ্কার করছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক সামরিক পদক্ষেপ ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিশ্ব অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতিতে ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর এখন প্রশ্ন উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন উপায় কী?
ব্যর্থ মার্কিন কৌশল ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা
দীর্ঘদিন ধরে আরব বিশ্বের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি নিরাপত্তাবলয় মেনে নিয়ে ওয়াশিংটনের এজেন্ডায় সায় দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বলছে, মার্কিন এই নীতি ব্যর্থ হয়েছে। ওমানে স্বাক্ষরিত চুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালিতে বারবার লঙ্ঘিত হতে থাকা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি প্রমাণ করেছে যে, শুধু বলপ্রয়োগ করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যর্থতা মূলত দুটি বড় শিক্ষা দিয়ে গেল: প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে বাদ দিয়ে এখানে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কী উপায়?
বর্তমান জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে ওয়াশিংটনের সামনে এখন সীমিত কিছু পথ খোলা রয়েছে:
১. বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও নতুন অংশীদারিত্ব
একক আধিপত্যের মানসিকতা বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন চীন, রাশিয়া এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর (যেমন ওমান ও কাতার) সাহায্য নিতে হবে। ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বহুপাক্ষিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নতুন চুক্তির কোনো বিকল্প নেই।
২. উপসাগরীয় দেশগুলোর নীতি পরিবর্তন
যেসব আরব দেশ এতদিন মার্কিন ছত্রচ্ছায়ায় ছিল, তারা এখন নতুন কৌশল খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের এই স্বায়ত্তশাসনকে সম্মান জানাতে হবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরব দেশগুলো এবং ইরানের মধ্যে সরাসরি সংলাপের পরিবেশ তৈরি করতে ওয়াশিংটনকে পরোক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।
৩. অবরোধ ও সামরিক আগ্রাসন নীতি পরিহার
নিষেধাজ্ঞা ও একের পর এক বিমান হামলা চালিয়ে ইরানকে দমানোর মার্কিন নীতি বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এতে উল্টো বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। তাই যুদ্ধংদেহী মনোভাব বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রণোদনার (Incentives) মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেষ্টা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের পতন এখন এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা। ওয়াশিংটন যদি তাদের পুরোনো ‘দাবার ছক’ আঁকড়ে ধরে থাকে, তবে এই অঞ্চল আরও বড় কোনো মহাবিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে।