Home বিশ্ব প্রকৃতির এক জীবন্ত রহস্য ‘মৃত সাগর’: হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম ও এর অজানা ইতিহাস

প্রকৃতির এক জীবন্ত রহস্য ‘মৃত সাগর’: হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম ও এর অজানা ইতিহাস

0
প্রকৃতির এক জীবন্ত রহস্য ‘মৃত সাগর’: হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম ও এর অজানা ইতিহাস
জনমানবহীন নিস্তব্ধ মৃত সাগর; অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে যেখানে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে না, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আজ সেই প্রাকৃতিক বিস্ময়টিও বিলুপ্তির সংকটে।

নিউজ ডেস্ক || পাবনা নিউজ ২৪

৮ জুলাই, ২০২৬

পৃথিবীর বুকে এমন এক জলাশয় রয়েছে যেখানে কোনো মানুষ চাইলেও ডুবে যেতে পারে না। লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই পানির ওপর অনায়াসে ভেসে থাকা যায়, ঠিক যেমনটা আমরা কোনো আরামদায়ক বিছানায় শুয়ে থাকি। অদ্ভুত ও অলৌকিক এই জলাশয়টির নাম ‘মৃত সাগর’ বা ডেড সি (Dead Sea)। জর্ডান, ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের সীমানা ঘেঁষে অবস্থিত এই হ্রদটি যুগ যুগ ধরে বিশ্বজুড়ে মানুষের কাছে এক পরম বিস্ময়।তবে কেবল ভেসে থাকার গল্পই নয়, মৃত সাগরের গভীরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস, ধর্মীয় উপাখ্যান এবং আধুনিক বিজ্ঞানের এক জটিল সমীকরণ। ২০২৬ সালে এসে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম প্রভাবে এই প্রাচীন হ্রদটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে, যা পরিবেশ বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। পাবনা নিউজ ২৪-এর আজকের বিশেষ ফিচারে আমরা উন্মোচন করব মৃত সাগরের সেইসব অজানা ইতিহাস ও রোমাঞ্চকর তথ্য।

ভৌগোলিক বিস্ময়: পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু বিন্দু

মৃত সাগরকে ‘সাগর’ বলা হলেও এটি মূলত একটি ল্যান্ডলকড হ্রদ বা চারপাশ দিয়ে ঘেরা হ্রদ। এর সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য হলো, এটি পৃথিবীর প্রধান ভূখণ্ডের সবচেয়ে নিচু বিন্দু (Lowest Point on Earth)। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এটি প্রায় ১,৪১৪ ফুট (৪৩০ মিটার) গভীরে অবস্থিত। এই হ্রদের পানির প্রধান উৎস জর্ডান নদী, কিন্তু এখান থেকে পানি বের হওয়ার কোনো পথ বা আউটলেট নেই। চারপাশের তীব্র তাপমাত্রা ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে অনবরত পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়, যার ফলে পানির নিচের খনিজ ও লবণগুলো আটকা পড়ে এক ঘন দ্রবণ তৈরি করে।

কেন এই হ্রদে কোনো জীবন নেই?

সাধারণ সমুদ্রের পানির তুলনায় মৃত সাগরের পানি প্রায় ১০ গুণ বেশি লবণাক্ত। এর লবণাক্ততার হার প্রায় ৩৪.২ শতাংশ। অতিরিক্ত লবণের ঘনত্বের কারণে এই পানিতে কোনো মাছ, জলজ উদ্ভিদ, শামুক বা কোনো অণুজীব বেঁচে থাকতে পারে না। আর এই কারণেই প্রাচীনকাল থেকে একে ‘মৃত সাগর’ বা ‘ডেড সি’ বলে ডাকা হয়।মানুষ কেন এখানে ডুবে না? (বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা): পানির ঘনত্ব যখন মানুষের শরীরের গড় ঘনত্বের চেয়ে বেশি হয়, তখন প্লাবতা বলের (Buoyancy) কারণে যেকোনো বস্তু ওপরে ভেসে থাকে। মৃত সাগরের পানিতে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম এবং পটাসিয়াম ক্লোরাইড দ্রবীভূত থাকায় এর পানির ঘনত্ব সাধারণ পানির চেয়ে অনেক বেশি। ফলে কোনো সাঁতার না জানা মানুষও এখানে অনায়াসে ভেসে থাকতে পারেন। 

প্রাচীন ইতিহাস ও ধর্মীয় উপাখ্যান

মৃত সাগরের ইতিহাস প্রাচীন সভ্যতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হিব্রু বাইবেল এবং পবিত্র কুরআনে এই অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে। ধর্মীয় ইতিহাস অনুযায়ী, এই অঞ্চলেই একদা হযরত লূত (আঃ)-এর অবাধ্য উম্মত ও ‘সাদুম’ (Sodom) নগরী অবস্থিত ছিল। তাদের পাপের শাস্তিস্বরূপ মহান সৃষ্টিকর্তা এই অঞ্চলকে উল্টে দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তা এক লবণের হ্রদে পরিণত হয় বলে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে বর্ণনা রয়েছে।গ্রিক ও রোমান যুগেও এই হ্রদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। মিশরের বিখ্যাত রানী ক্লিওপেট্রা এই মৃত সাগরের ভক্ত ছিলেন। তিনি এই হ্রদের তীরবর্তী অঞ্চলে নিজস্ব কসমেটিকস ও ফার্মাসিউটিক্যালস ফ্যাক্টরি গড়ে তুলেছিলেন। রোমান সম্রাট গ্রেট হেরোডও তার বিভিন্ন চর্মরোগ নিরাময়ের জন্য মৃত সাগরের প্রাকৃতিক স্পা ও কাদা ব্যবহার করতেন।

ওষুধি গুণের খনি ও আধুনিক কসমেটিকস ইন্ডাস্ট্রি

মৃত সাগরের পানি যেমন বিষাক্ত, তেমনি এর তলদেশের কালো কাদা (Black Mud) খনিজের এক অলৌকিক ভাণ্ডার। এই কাদায় এমন ২৬টি বিশেষ খনিজ উপাদান রয়েছে, যার মধ্যে ১২টি পৃথিবীর অন্য কোনো সাধারণ সাগরের পানিতে পাওয়া যায় না।

ত্বকের যত্ন: এখানকার খনিজ উপাদান ত্বকের সোরিয়াসিস, একজিমা এবং অতিরিক্ত ব্রণ দূর করতে জাদুর মতো কাজ করে।

শ্বাসকষ্ট উপশম: এই অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের মাত্রা সাধারণ এলাকার চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ বেশি এবং এখানে ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি (UV rays) সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না। ফলে হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের রোগীরা এখানে এসে প্রাকৃতিক নিরাময় লাভ করেন।

২০২৬-এর মহাসংকট: বিলুপ্তির পথে ডেড সি?

বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, মৃত সাগর অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সংকুচিত হচ্ছে। প্রতি বছর এই হ্রদের পানির স্তর প্রায় ৩.৩ ফুট (১ মিটার) করে নিচে নেমে যাচ্ছে। এর মূল কারণ জর্ডান নদীর পানিকে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও কৃষি কাজে ডাইভার্ট বা সরিয়ে নেওয়া। পানির স্তর নেমে যাওয়ার ফলে চারপাশের মাটিতে হাজার হাজার ‘সিঙ্কহোল’ বা বিশালাকার গর্ত তৈরি হচ্ছে, যা পর্যটন ও স্থানীয় অবকাঠামোর জন্য এক বড় হুমকি। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে এই প্রাকৃতিক বিস্ময়টি পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here