Home লাইফস্টাইল বয়স ধরে রাখার আধুনিক উন্মাদনা ‘বায়োহ্যাকিং’: নিজের শরীরকে হ্যাক করার বিজ্ঞান ও বিতর্ক

বয়স ধরে রাখার আধুনিক উন্মাদনা ‘বায়োহ্যাকিং’: নিজের শরীরকে হ্যাক করার বিজ্ঞান ও বিতর্ক

0
বয়স ধরে রাখার আধুনিক উন্মাদনা ‘বায়োহ্যাকিং’: নিজের শরীরকে হ্যাক করার বিজ্ঞান ও বিতর্ক

নিউজ ডেস্ক || পাবনা নিউজ ২৪

৮ জুলাই, ২০২৬

অমরত্ব বা চিরযৌবন পাওয়ার আকঙ্ক্ষা মানুষের আদিমতম স্বভাব। হাজার বছর আগে রাজ-বাদশাহরা চিরকাল তরুণ থাকার জন্য কত না কবিরাজি রসায়ন আর অলৌকিক ওষুধের খোঁজ করতেন! তবে ২০২৬ সালের আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে এসে সেই যৌবন ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা আর কোনো রূপকথা নয়, বরং রূপান্তরিত হয়েছে একটি বৈজ্ঞানিক ক্রেজ বা উন্মাদনায়। বর্তমান বিশ্বে এই ট্রেন্ডটির নাম ‘বায়োহ্যাকিং’ (Biohacking)।সহজ কথায়, বায়োহ্যাকিং হলো নিজের শরীরের জীববৈজ্ঞানিক সিস্টেমকে (Biological System) হ্যাক বা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। নির্দিষ্ট কিছু ডায়েট, আধুনিক গ্যাজেট, জিনগত পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির সাহায্যে নিজের ডিএনএ (DNA) ও মেটাবলিজমকে (Metabolism) কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই এর মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে মানুষ তার বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করতে চায় এবং শরীরের কর্মক্ষমতা শতভাগ বাড়াতে চায়।সিলিকন ভ্যালির টেক বিলিয়নেয়ারদের হাত ধরে শুরু হওয়া এই লাইফস্টাইল ট্রেন্ডটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে উচ্চবিত্ত ও তরুণ প্রজন্মের মাঝে এক নতুন ক্রেজ তৈরি করেছে। পাবনা নিউজ ২৪-এর আজকের বিশেষ ফিচারে আমরা আলোচনা করব এই বায়োহ্যাকিংয়ের খুঁটিনাটি, বিজ্ঞান এবং এর ভেতরের ঝুঁকিগুলো।

বায়োহ্যাকিং আসলে কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজের শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতা বাড়ানোর যেকোনো ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাই হলো বায়োহ্যাকিং। এটিকে ‘ডু-ইট-ইউরসেলফ’ (DIY) বায়োলজি বা নিজের শরীর নিয়ে নিজেই গবেষণা করাও বলা চলে।বায়োহ্যাকারদের মূল দর্শন হলো—আমাদের শরীর একটি জটিল সফটওয়্যারের মতো। সঠিক ডেটা, সঠিক পুষ্টি এবং সঠিক পরিবেশ দিলে এই সফটওয়্যারকে নিজের ইচ্ছেমতো অপ্টিমাইজ বা রি-প্রোগ্রাম করা সম্ভব। এর মাধ্যমে একজন মানুষ তার ঘুমের মান উন্নত করতে পারে, স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ করতে পারে এবং বয়সকে শরীরের কোষের স্তরে (Cellular Level) থমকে দিতে পারে।

বায়োহ্যাকিংয়ের প্রধান স্তম্ভসমূহ

বর্তমান সময়ে বায়োহ্যাকাররা তাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে মূলত তিনটি প্রধান পদ্ধতি বা স্তম্ভ ব্যবহার করছেন:

নিউট্রিশনাল বায়োহ্যাকিং (Nutritional Biohacking): এটি কেবল সাধারণ ডায়েট নয়। বায়োহ্যাকাররা প্রতিদিন তাদের রক্তের সুগার, লিপিড প্রোফাইল এবং ডিএনএ টেস্ট করে নির্ধারণ করেন তাদের কোষের জন্য ঠিক কোন পুষ্টি উপাদানটি প্রয়োজন। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং (Intermittent Fasting), নোওট্রপিকস (মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ানোর সাপ্লিমেন্ট) এবং বুলেটপ্রুফ কফির মতো আধুনিক ডায়েট ট্রেন্ডগুলো এর অন্তর্ভুক্ত।

টেকনোলজিক্যাল বায়োহ্যাকিং ও পরিধানযোগ্য গ্যাজেট: ২০২৬ সালে এসে ওউরা রিং (Oura Ring), কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর (CGM) এবং উন্নত স্মার্টওয়াচের মাধ্যমে মানুষ প্রতি সেকেন্ডে তাদের হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি (HRV), শরীরের তাপমাত্রা এবং মেটাবলিক রেট ট্র্যাক করছে। এই ডেটা অ্যানালিসিস করে তারা তাদের দৈনন্দিন কাজ ও বিশ্রামের সময় নির্ধারণ করে।

অ্যাডভান্সড বা জেনেটিক বায়োহ্যাকিং: এটি বায়োহ্যাকিংয়ের সবচেয়ে চরম রূপ। এখানে ক্রিসপার (CRISPR) প্রযুক্তির মতো জিন-এডিটিং টুলের সাহায্যে নিজেদের ডিএনএ-তে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়। এর পাশাপাশি অনেকে স্টেম সেল থেরাপির (Stem Cell Therapy) মাধ্যমে শরীরের বুড়ো হয়ে যাওয়া কোষগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করছেন।

বয়স ধরে রাখার চরম উন্মাদনা: ‘প্রজেক্ট ব্লুপ্রিন্ট’ বিতর্ক

বায়োহ্যাকিংয়ের কথা উঠলে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত নাম টেক বিলিয়নেয়ার ব্রায়ান জনসন। তিনি তার ‘প্রজেক্ট ব্লুপ্রিন্ট’-এর মাধ্যমে বছরে কোটি কোটি ডলার খরচ করছেন নিজের ৪৫ বছর বয়সী শরীরকে ১৮ বছরের তরুণের শরীরে ফিরিয়ে নিতে।

ব্রায়ান জনসনের দৈনন্দিন বায়োহ্যাকিং রুটিন: ১. প্রতিদিন নিয়ম মেনে শতাধিক সাপ্লিমেন্ট ও কাস্টমাইজড পুষ্টি উপাদান গ্রহণ। ২. কঠোর ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর ব্যায়ামের শিডিউল মেইনটেইন করা। ৩. প্রতি রাতে নিখুঁত সময়ে ঘুমানো এবং আল্ট্রাভায়োলেট লাইট থেরাপি নেওয়া। ৪. নিজের শরীরের তরুণ তরতাজা প্লাজমা ইনজেকশনের মাধ্যমে নিজের রক্তে পুশ করা। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের একাংশের দাবি, ব্রায়ানের এই পরীক্ষার পর তার শরীরের এপিজেনেটিক বয়স (Epigenetic Age) বা কোষের বয়স প্রায় ৫ বছর কমেছে। এই সফলতাই বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষকে বায়োহ্যাকিংয়ের প্রতি অন্ধভাবে আকৃষ্ট করছে।

অন্ধ অনুকরণ এবং এর স্বাস্থ্যঝুঁকি

বাইরে থেকে বায়োহ্যাকিংকে যতটা জাদুকরী মনে হয়, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে মারাত্মক সব স্বাস্থ্যঝুঁকি। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গবেষকরা এই ট্রেন্ড নিয়ে বারবার সতর্ক করছেন।প্রথমত, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত নোওট্রপিকস বা কৃত্রিম হরমোন সাপ্লিমেন্ট সেবনের ফলে কিডনি এবং লিভার বিকল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দ্বিতীয়ত, ঘরের ভেতরে ল্যাব বানিয়ে নিজে নিজে ডিএনএ বা জিন পরিবর্তনের চেষ্টা করা অত্যন্ত বিপজ্জনক, যা ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের জন্ম দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজনের শরীরের জন্য যা উপকারী, অন্ধভাবে তা অনুকরণ করলে অন্যজনের শরীরে তা বিষ হিসেবে কাজ করতে পারে।প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চিরকাল তরুণ থাকার এই বৈজ্ঞানিক চেষ্টা বা বায়োহ্যাকিং হয়তো আমাদের ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানকে বদলে দেবে। তবে প্রযুক্তি এবং গ্যাজেটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে নিজের শরীরকে একটি ল্যাবরেটরির গিনিপিগ বানিয়ে ফেলা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপমুক্ত জীবন, প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন এবং প্রাকৃতিক উপায়ে সুষম ডায়েট মেনে চলাই হলো সবচেয়ে নিরাপদ ও আদিম ‘বায়োহ্যাকিং’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here