Home আইন ও আদালত বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা: সংকোচনমূলক অবস্থান অব্যাহত, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে গুঞ্জন না ছড়ানোর আহ্বান গভর্নরের

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা: সংকোচনমূলক অবস্থান অব্যাহত, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে গুঞ্জন না ছড়ানোর আহ্বান গভর্নরের

0
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা: সংকোচনমূলক অবস্থান অব্যাহত, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে গুঞ্জন না ছড়ানোর আহ্বান গভর্নরের
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা! বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোশতাকুর রহমান জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রকাশ করেন এবং ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কোনো ধরনের গুঞ্জন ছড়াতে সবাইকে বারণ করেন।

নিউজ ডেক্স: পাবনা নিউজ ২৪

০১ জুলাই, ২০২৬ |

দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতি (Inflation) নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে নতুন মুদ্রানীতি (Monetary Policy Statement) ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম অর্ধে অর্থাৎ ‘জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬’ মেয়াদের জন্য এই মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর মো. মোশতাকুর রহমান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন নীতিমালার ঘোষণা দেন। এটি তার মেয়াদে ঘোষিত প্রথম মুদ্রানীতি। নতুন এই মুদ্রানীতিতে দেশের ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট দূরীকরণ এবং বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল খাতে ঋণ প্রবাহ ঠিক রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সাথে গভর্নর দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক’ নিয়ে বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ধরণের গুঞ্জন ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো ধরণের বিভ্রান্তি না ছড়াতে দেশবাসী ও বিনিয়োগকারীদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন। পাবনা নিউজ ২৪-এর বিশেষ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে জেনে নিন এই মুদ্রানীতির খুঁটিনাটি বিস্তারিত।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান: নীতি সুদহার অপরিবর্তিত

চলতি বছরের মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৯.৪২ শতাংশে, যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও ডলারের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে সৃষ্ট এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক পূর্বের ‘সংকোচনমূলক’ (Contractionary) মুদ্রানীতি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জরুরি ঋণ নেয়, তখন যে সুদ দিতে হয় বা মূল নীতি সুদহার (Repo Rate), তা ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

এর পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (SLF) বা সর্বোচ্চ সুদহারের সীমা ১১.৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (SDF) বা সর্বনিম্ন সুদহারের ফ্লোর রেট ৭.৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য হলো বাজারে টাকার প্রবাহ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রেখে আসন্ন অর্থবছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা এবং জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ অর্জন করা।

বেসরকারি খাতের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা হ্রাস ও ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশাল প্রণোদনা

দেশের বাজারে বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দাভাব এবং ব্যাংকগুলোর বাড়তি সতর্কতার কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি অনেক কমে গেছে। গত মে মাস নাগাদ এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল মাত্র ৪.৯৮ শতাংশ। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন মেয়াদে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পূর্বের ৮.৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬.৮ শতাংশ নির্ধারণ করেছে।

তবে এই ঋণ সংকোচনের ফলে যাতে দেশের উৎপাদনশীল খাত স্থবির হয়ে না পড়ে, সেজন্য গভর্নর মো. মোশতাকুর রহমান একটি বিশাল ঘোষণা দিয়েছেন। দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা পুনরুজ্জীবিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষি ও কুটির-ক্ষুদ্র-মাঝারি (CMSME) শিল্পের প্রসারে ৬০,০০০ কোটি টাকার (৬০০ বিলিয়ন টাকা) একটি বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪১,০০০ কোটি টাকা ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য এবং ১৯,০০০ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে。 তবে গভর্নর স্পষ্ট করে বলেছেন, “সব বন্ধ কারখানা এই সুবিধা পাবে না। বিদ্যুৎ, গ্যাস বা জ্বালানি সংকটে বন্ধ থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানকে লোন দেওয়া হবে না। শুধুমাত্র সাময়িকভাবে আর্থিক সংকটে পড়া সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোই কঠোর শর্তসাপেক্ষে এই ঋণ পাবে।”

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে গুজবের কড়া জবাব

সংবাদ সম্মেলনের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল দেশের শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বিশেষ করে ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’ সংক্রান্ত আলোচনা। গত কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এবং তারল্য নিয়ে নানা ধরণের নেতিবাচক গুঞ্জন ছড়ানো হচ্ছিল। এ প্রসঙ্গে গভর্নর মো. মোশতাকুর রহমান অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি সবাইকে কোনো ধরণের অনুমান বা ভিত্তিহীন গুজবের ওপর ভিত্তি করে বিভ্রান্তি না ছড়াতে কঠোরভাবে অনুরোধ করেন।

গভর্নর আশ্বস্ত করে বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সাধারণ আমানতকারীদের জমানো টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইতিপূর্বেও শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কাটাতে ১.২ ট্রিলিয়ন টাকারও বেশি বিশেষ তারল্য সহায়তা ও গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়া ব্যাংকিং খাতের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গা নিয়ে অপপ্রচার চালানো দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর, তাই তিনি গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হয়ে ব্যাংকের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান।

খেলাপি ঋণ কমাতে ১৮ মাসের বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম

নতুন মুদ্রানীতিতে ব্যাংক খাতের প্রধান ক্যান্সার ‘খেলাপি ঋণ’ (NPL) কমাতে একটি বড় ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড (IFRS 9) অনুযায়ী খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা আরও কঠোর করা হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর অনাদায়ী ও মন্দ লোনগুলো যাতে সাধারণ করদাতাদের টাকার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত আদায় করা যায়, সেজন্য প্রস্তাবিত ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ (DAMA) চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর ইন্টারমেডিয়েশন স্প্রেড বা ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মধ্যে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, যা আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতা উভয় পক্ষকেই সুরক্ষা দেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের মুদ্রানীতিটি একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতি কমাতে অত্যন্ত কঠোর ও সতর্ক, অন্যদিকে উৎপাদনশীল খাতের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার এক ভারসাম্যপূর্ণ চেষ্টা। নতুন গভর্নর মো. মোশতাকুর রহমানের এই প্রথম নীতিগত পদক্ষেপটি যদি মাঠপর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা। পাবনা নিউজ ২৪-এর অর্থনৈতিক ডেক্স থেকে দেশের আর্থিক খাতের সকল খবরের ওপর আমাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here