Home ফিচার ২০০৮ সালের পর বিশ্ববাজারে সোনার দামে সবচেয়ে বড় পতন: ২৫% ধসে আউন্স নামল ৪ হাজার ডলারের নিচে, বড় ধাক্কা বাংলাদেশেও

২০০৮ সালের পর বিশ্ববাজারে সোনার দামে সবচেয়ে বড় পতন: ২৫% ধসে আউন্স নামল ৪ হাজার ডলারের নিচে, বড় ধাক্কা বাংলাদেশেও

0
২০০৮ সালের পর বিশ্ববাজারে সোনার দামে সবচেয়ে বড় পতন: ২৫% ধসে আউন্স নামল ৪ হাজার ডলারের নিচে, বড় ধাক্কা বাংলাদেশেও
২০০৮ সালের পর বিশ্ববাজারে সোনার দামে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়!

নিউজ ডেক্স: পাবনা নিউজ ২৪

০১ জুলাই, ২০২৬ |

বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক আলোড়ন সৃষ্টি করে বিশ্ববাজারে সোনার দামে বিশাল পতন ঘটেছে। বছরের শুরুতেই যে সোনার দাম আকাশচুম্বী রেকর্ড গড়েছিল, তা মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা এবং ২০১৩ সালের পর এটিই সোনার বাজারে একক কোনো প্রান্তিকে সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘমেয়াদী পতনের রেকর্ড। বিশ্ববাজারের এই বিশাল ধাক্কা এসে লেগেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও, যেখানে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) দফায় দফায় সোনার দাম কমাতে বাধ্য হয়েছে। সোনার বাজারের এই নজিরবিহীন ধস, এর পেছনের মূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক কারণ এবং দেশীয় বাজারে এর প্রভাব নিয়ে পাবনা নিউজ ২৪-এর বিশেষ বিশদ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।

রেকর্ড ভাঙা উত্থানের পর ঐতিহাসিক পতন

২০২৪ ও ২০২৫ সালজুড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল সোনা। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিনিয়োগকারীদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় বা ‘সেফ হ্যাভেন’ ছিল এই মূল্যবান ধাতু। ফলস্বরূপ, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স (oz) সোনার দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫,৫৮৯ মার্কিন ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল

তবে জানুয়ারির সেই রেকর্ড ছোঁয়ার পর থেকেই সোনার বাজারে এক অদৃশ্য মড়ক লাগে। জুন মাসের শেষ সপ্তাহ নাগাদ আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে সোনার দাম প্রায় ২৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত ধসে গেছে। গত ২৪ জুনের পর থেকে সোনা তার অন্যতম শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক সাপোর্ট লাইন ৪,০০০ ডলারের নিচে নেমে বর্তমানে ৪,০১৫ ডলারের আশেপাশে ট্রেড করছে, যা গত ১৩ বছরের ইতিহাসে কোনো একক প্রান্তিকে (Quarter) সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স।

কেন এই ঐতিহাসিক ধস? পেছনের ৪টি মূল কারণ:

অর্থনৈতিক ও পণ্যবাজার বিশেষজ্ঞরা সোনার দামের এই নজিরবিহীন পতনের পেছনে মূলত বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের কিছু নীতিকে দায়ী করছেন:

মার্কিন ডলারের অভাবনীয় উত্থান:বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের সূচক (Dollar Index) বহুবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, ডলার শক্তিশালী হলে অ-ডলারধারী দেশগুলোর জন্য সোনা কেনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী সোনার চাহিদা ব্যাপক হারে কমে যায় এবং দাম হু হু করে নামতে থাকে।

মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের কড়া অবস্থান (Interest Rates): বছরের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাবে। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে নতুন করে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিলে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর পরিবর্তে উল্টো আরও বাড়ানোর বা কড়া রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। সোনা যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট ডিভিডেন্ড বা সুদ দেয় না (Non-yielding asset), তাই সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় বড় বিনিয়োগকারীরা সোনা বিক্রি করে বন্ড মার্কেটের দিকে ঝুঁকছেন।

মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতি:রাশিয়া-ইউক্রেনের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইরানের মধ্যকার তীব্র উত্তেজনা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় এ উত্তেজনা কিছুটা শিথিল হওয়ার আভাস পাওয়ায় এবং তেলের বাজার স্বাভাবিক হতে শুরু করায় সোনা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের বিনিয়োগ তুলে নিতে শুরু করেছেন বৈশ্বিক ট্রেডাররা।

বড় বড় ফান্ড ও ইটিএফ (ETF) আউটফ্লো: আন্তর্জাতিক সোনার বাজার নিয়ন্ত্রণ করে গোল্ড ইটিএফ বা এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডগুলো। এশিয়াসহ বিশ্ববাজারের বড় বড় ফান্ডগুলো থেকে গত কয়েক মাসে রেকর্ড পরিমাণ সোনা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে, যা বাজারে সোনার অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি করেছে এবং দামের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে।

বাংলাদেশী বাজারে বড় ধাক্কা: দুই দিনে রেকর্ড কমেছে দাম

বিশ্ববাজারের এই মহাপতনের প্রভাব বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারেও চরমভাবে প্রতিফলি হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) আন্তর্জাতিক তেজাবী সোনার (বিশুদ্ধ সোনা) দাম হ্রাসের সাথে সংগতি রেখে দেশের বাজারে সোনার দাম পুনঃনির্ধারণ করেছে।

জুন মাসের শেষ দুই দিনেই বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় দরপতনের ঘটনা ঘটেছে। বাজুস দুই দফায় ভরিতে ৬,৫৯০ টাকা পর্যন্ত দাম কমিয়েছ নতুন সমন্বয় অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেট সোনার প্রতি ভরির দাম ২,২৫,২৯০ টাকা থেকে কমে এখন ২,২১,৯৬৬ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে ২১ ক্যারেট সোনার দাম ২,১১,৯৯৩ টাকা এবং ১৮ ক্যারেট সোনার দাম ১,৮২,০৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজুসের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশীয় বাজারে স্বর্ণালংকার ক্রেতাদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছেন।

ভবিষ্যত বাণী: সোনা কি আরও কমবে?

বিশ্বের নামী-দামী বৈশ্বিক ব্যাংকগুলো সোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। গোল্ডম্যান স্যাক্স (Goldman Sachs) তাদের বছরের শেষ লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৪,৯০০ ডলারে নামিয়েছে। অন্যদিকে জেপি মরগান (J.P. Morgan) এবং ব্যাংক অব আমেরিকা মনে করছে, এই পতন সাময়িক এবং বছরের শেষ নাগাদ সোনা আবারও ঘুরে দাঁড়িয়ে ৫,৫০০ থেকে ৬,০০০ ডলার স্পর্শ করতে পারে, কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখনও তাদের রিজার্ভে ব্যাপক হারে সোনা মজুত করছে。

২০০৮ সালের পর সোনার বাজারে এমন ধস প্রমাণ করে যে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতি কতটা পরিবর্তনশীল এবং আনপ্রেডিক্টেবল। ডলারের আধিপত্য এবং সুদের হারের খেলা সোনার চেনা গতিপথকে বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশের বাজারে এই দামের পতন সাধারণ ক্রেতাদের জন্য সোনা বা গহনা কেনার একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করলেও, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা আগামী দিনগুলোতেও বজায় থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাবনা নিউজ ২৪-এর পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক এই খবরের ওপর আমাদের নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here