নিউজ ডেক্স: পাবনা নিউজ ২৪
০১ জুলাই, ২০২৬:
এক সময় বাংলাদেশের মানুষের প্রধান শত্রু ছিল ওলাউঠা বা ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া এবং যক্ষ্মার মতো সংক্রামক রোগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতিতে সেসব রোগ আমরা জয় করেছি ঠিকই, কিন্তু জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও অসচেতনতার কারণে বাঙালি জাতি এখন অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে অসংক্রামক রোগ বা ‘নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস’ (NCDs)-এর জালে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশেরই কারণ অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনজনিত কিছু রোগ।
আমাদের দেশের মানুষের শরীরে কেন এসব জটিল রোগ বাসা বাঁধছে, এর মূল কারণগুলো কী এবং কীভাবে আমরা ঘরোয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে এগুলো প্রতিরোধ করতে পারি—তা নিয়ে পাবনা নিউজ ২৪-এর বিশেষ স্বাস্থ্য ও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন।
১. হৃদরোগ ও স্ট্রোক (Cardiovascular Diseases)
বর্তমানে বাংলাদেশে অকাল মৃত্যুর এক নম্বর কারণ হলো হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাক এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক।
কেন হচ্ছে? (কারণ): রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া এর প্রধান কারণ। আমাদের অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত এবং অতিরিক্ত শর্করা (ভাত) খাওয়ার অভ্যাস ধমনীতে চর্বির স্তর তৈরি করে। এছাড়া অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ধূমপান এবং জ্যাম বা কাজের কারণে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অলস জীবনযাপন (Sedentary Lifestyle) হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
প্রতিকার: রান্নায় সয়াবিন তেল ও ডালডার ব্যবহার কমিয়ে সরিষার তেল বা রাইস ব্রান অয়েল ব্যবহার করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট দ্রুত হাঁটার অভ্যাস করা এবং ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন করা উচিত।
২. উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন (Silent Killer)
এ দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রতি ৪ জনের মধ্যে ১ জনই উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, যার একটি বড় অংশই টের পান না যে তারা এই রোগে আক্রান্ত।
কেন হচ্ছে? (কারণ): খাবারে কাঁচা লবণ (Sodium) খাওয়ার মারাত্মক প্রবণতা বাঙালির উচ্চ রক্তচাপের প্রধান উৎস। এছাড়া প্রক্রিয়াজাত প্যাকেটজাত খাবার, চিপস, ফাস্টফুড এবং অতিরিক্ত ওজন ধমনীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
প্রতিকার: পাতে বা ভাতের সাথে কাঁচা লবণ খাওয়া আজই বন্ধ করতে হবে। খাবারে পটাশিয়ামের মাত্রা বাড়াতে ডাবের পানি, কলা এবং সবুজ শাকসবজি বেশি খেতে হবে। নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করা জরুরি।
৩. টাইপ-২ ডায়াবেটিস (Silent Epidemic)
বাংলাদেশকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম প্রধান ডায়াবেটিস ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। শুধু শহর নয়, বর্তমানে গ্রামের মানুষের মাঝেও এই রোগ মহামারি আকার ধারণ করেছে।
কেন হচ্ছে? (কারণ): আমাদের অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস যখন পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না বা শরীর তা ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়। অতিরিক্ত মিষ্টি, কোমল পানীয় (Soft Drinks), ফাস্টফুড গ্রহণ এবং কোনো ধরণের কায়িক পরিশ্রম বা শরীরচর্চা না করার কারণে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়।
প্রতিকার: সাদা চালের ভাত ও ময়দার পরিমাণ কমিয়ে লাল চালের ভাত, ওটস বা লাল আটার রুটি খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। মিষ্টি ও কোল্ড ড্রিংকস এড়িয়ে চলতে হবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা ডায়াবেটিস প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি।
৪. দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ বা সিওপিডি (COPD)
অ্যাজমা, হাঁপানি এবং ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের মতো শ্বাসকষ্টজনিত রোগে এ দেশের কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত ভুগছেন।
কেন হচ্ছে? (কারণ): এর পেছনে মূল দায়ী আমাদের বিষাক্ত বাতাস। অপরিকল্পিত কনস্ট্রাকশন, কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া এবং কালো ধোঁয়ার কারণে বাতাসে ভেসে থাকা পিএম ২.৫ (PM2.5) কণা সরাসরি ফুসফুসকে ধ্বংস করছে। এছাড়া পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ধূমপান ফুসফুসের অ্যালভিওলাই নষ্ট করে দেয়।
প্রতিকার: ঘরের বাইরে বের হলেই সঠিক নিয়মে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। ঘরদোর ধুলাবালিমুক্ত রাখা এবং ধূমপায়ীদের থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি। বছরে অন্তত একবার ফুসফুসের কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করা ভালো।
৫. ক্যানসার এবং কিডনি বিকল (Cancer & Kidney Failure)
বাংলাদেশে ক্যানসার এবং কিডনি ডায়ালাইসিস রোগীর সংখ্যা গত কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।
কেন হচ্ছে? (কারণ): খাদ্যে ভেজাল (ফরমালিন, টেক্সটাইল রং, কার্বাইড) আমাদের লিভার ও কিডনির কোষগুলোকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে ক্যানসারের জন্ম দিচ্ছে। এছাড়া সামান্য মাথা ব্যথা বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হলেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে ইচ্ছামতো ব্যথানাশক (Painkiller) ও অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়ার ‘সেলফ-মেডিকেশন’ অভ্যাসই মূলত কিডনি বিকল বা ড্যামেজ হওয়ার প্রধান কারণ।
প্রতিকার: বাইরের খোলা খাবার ও কেমিক্যালযুক্ত ফলমূল বর্জন করতে হবে। পর্যাপ্ত পানি (দৈনিক ২.৫ থেকে ৩ লিটার) পান করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ডাক্তারের লিখিত প্রেসক্রিপশন ছাড়া যেকোনো ধরণের ওষুধ সেবনের অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।
সামগ্রিক মুক্তির উপায়: সুস্থ থাকার ৩টি সোনালী নিয়ম
মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে, একটু সচেতন হলেই এই নীরব ঘাতক রোগগুলো থেকে নিজেদের মুক্ত রাখা সম্ভব:
১. থ্রি-হোয়াইট পয়জন পরিহার: খাবারে তিনটি সাদা জিনিস—চিনি, কাঁচা লবণ এবং সাদা ময়দা বা চালের পরিমাণ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে।
২. কায়িক শ্রম বা হাঁটাচলা: প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার কদম হাঁটা বা ঘাম ঝরানো শরীরচর্চা করা বাধ্যতামূলক।
৩. পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: দৈনিক ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম শরীরকে নিজে থেকেই নিরাময় (Heal) করতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ কমাতে যোগব্যায়াম বা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা উচিত।