নিউজ ডেস্ক ,পাবনা নিউজ ২৪
একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক যুগে এসে বিশ্বজুড়ে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক সুরক্ষায় প্রযুক্তি খাতে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের নীল আলো যেভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গ্রাস করছে, তা নিয়ে বিশ্বনেতারা এখন চরম উদ্বিগ্ন। যার ফলশ্রুতিতে ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বের ২০টিরও বেশি প্রভাবশালী দেশ অনূর্ধ্ব ১৫ ও ১৬ বছর বয়সীদের জন্য মেটা (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম) কিংবা টিকটকের মতো বড় বড় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করতে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো ইতিমধ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার জন্য তাদের আইনসভায় বিল পাস করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও (EU) সমগ্র ইউরোপ জুড়ে এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত কঠোর ও অভিন্ন আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যখন বিশ্বজুড়ে শিশুদের ভার্চুয়াল আসক্তি থেকে মুক্ত করে খেলার মাঠে ফিরিয়ে নেওয়ার এই মহাপরিকল্পনা চলছে, তখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনবহুল দেশ বাংলাদেশ এই ডিজিটাল মহামারীর মুখে এখনো সম্পূর্ণ নীরব ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। দেশের লাখ লাখ শিশু প্রতিদিন স্ক্রিনের আলোয় তাদের শৈশব, মেধা আর মানসিক সুস্থতা হারালেও রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক পর্যায়ে এখনো কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।
বিশ্বজুড়ে আইনি নিষেধাজ্ঞার হিড়িক: শিশুদের মানসিক সুরক্ষায় বৈশ্বিক জোট
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো হুট করেই এই ধরণের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়নি; বরং বছরের পর বছর ধরে চলা সাইকোলজিক্যাল ও মেডিকেল গবেষণার ভয়ঙ্কর সব ফলাফল সামনে আসার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার শিশুদের মস্তিষ্কের ‘ডোপামিন’ নামক হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণ প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে, যা মাদকাসক্তির সমতুল্য। এই ভার্চুয়াল বন্দিত্ব থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই আইন অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি ডলার জরিমানা গুনতে হবে। যুক্তরাজ্যের সরকারও একই পথ অনুসরণ করে ‘অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট’ আরও জোরদার করেছে, যাতে ১৫ বছরের কম বয়সীরা কোনোভাবেই মা-বাবার অজান্তে মেটা বা টিকটকে অ্যাকাউন্ট খুলতে না পারে। এশিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষা এবং কিশোর অপরাধ (গ্যাং কালচার) রুখতে অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মনে করে, সোশ্যাল মিডিয়ার সাইবার বুলিং, বডি শেমিং এবং ক্ষতিকর কন্টেন্ট শিশুদের মধ্যে আত্মহত্যা, তীব্র বিষণ্নতা এবং ইনসোমনিয়া বা চিরতরে ঘুমহীনতার মতো ভয়ঙ্কর মানসিক ব্যাধি তৈরি করছে, যা একটি পুরো প্রজন্মকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে? আমাদের দেশে এখনো আইন না হওয়ার নেপথ্য কারণ
বিশ্বের এতগুলো দেশ যখন তাদের শিশুদের সুরক্ষায় কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে, তখন বাংলাদেশে এই বিষয়ে কোনো প্রকার আইনি খসড়া বা নীতিনির্ধারণী আলোচনাও দৃশ্যমান নয়। আমাদের দেশে এই অলসতা এবং আইন না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও পরিকাঠামোঘত কারণ লুকিয়ে রয়েছে। প্রথমত, আমাদের নীতিনির্ধারকেরা এখনো ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এবং ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর ধারণাকে কেবলই প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে বিবেচনা করেন, এর অপব্যবহার বা কুফল নিয়ে তাদের গভীর গবেষণার অভাব রয়েছে। ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া যে একটি শিশুর জন্য কোকেন বা অন্য কোনো মাদকের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে, এই চিন্তাটুকু এখনো আমাদের আইনি কাঠামোর ভেতর প্রবেশ করেনি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে শিশুদের সুরক্ষায় ডেটা প্রাইভেসির কোনো সুনির্দিষ্ট বা আধুনিক আইন নেই। ইউরোপ বা আমেরিকায় যেমন টেক জায়ান্টদের বাধ্য করা যায় শিশুদের ডেটা ফিল্টার করতে, আমাদের দেশে সেই ধরণের প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ বা আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি। তৃতীয়ত, আমাদের দেশের সরকার ও আমলারা মনে করেন এই ধরণের নিষেধাজ্ঞা ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা ইন্টারনেট ফ্রিডমের পরিপন্থী হতে পারে, যা একটি চরম ভুল ধারণা। কারণ যে প্রযুক্তি শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ রুখে দেয়, তাকে কখনোই স্বাধীনতার অংশ বলা যায় না। ফলে সঠিক দূরদর্শিতার অভাব এবং উদাসীনতার কারণে আমাদের দেশের শিশুরা এক উন্মুক্ত সাইবার দুনিয়ায় চরম অরক্ষিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।
আমরা কেন সচেতন হচ্ছি না? সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়ের রূঢ় বাস্তব চিত্র
রাষ্ট্রীয় আইনের অভাবের চেয়েও বড় সংকট হলো আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক স্তরের চরম অসচেতনতা। বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারে এখন স্মার্টফোন হয়ে উঠেছে শিশুদের শান্ত রাখার বা ভাত খাওয়ানোর প্রধান ‘খেলনা’ বা জাদুকরী মাধ্যম। শহরের ফ্ল্যাট বাড়িগুলো থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত—সবখানেই মা-বাবারা নিজেদের ব্যস্ততা এড়াতে বা সন্তানকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে অবলীলায় তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন ইন্টারনেট সংযোগসহ মোবাইল ফোন। আমরা কেন এখনো সচেতন হচ্ছি না, তার প্রধান কারণ হলো আমরা এই আসক্তিকে কোনো রোগ বা সমস্যা হিসেবে মনেই করছি না। আমাদের সমাজে এখনো ধারণা করা হয় যে, সন্তান ঘরে বসে মোবাইল টিপলে সে অন্তত বাইরে গিয়ে নষ্ট হবে না বা কোনো অপরাধে জড়াবে না। কিন্তু তারা বুঝতে পারছেন না যে, ঘরের কোণে বসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা শিশুটি সাইবার জগতের এমন সব অন্ধকার গহ্বরে প্রবেশ করছে, যা তার নৈতিকতা ও মেধাকে ভেতর থেকে একবারে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। এছাড়া আমাদের দেশে মাঠের অভাব এবং যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গড়ে ওঠার কারণে শিশুরা প্রচণ্ড একাকীত্বে ভোগে, আর এই একাকীত্ব দূর করার সহজ উপায় হিসেবে তারা বেছে নেয় ফেসবুকের রিলস বা টিকটকের শর্ট ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগের এই ছদ্মবেশী জাল শিশুদের এতটাই আচ্ছন্ন করে ফেলেছে যে, তারা এখন মা-বাবার সাথে কথা বলার চেয়ে ভার্চুয়াল লাইক-কমেন্টকে বেশি আপন মনে করে।
ভয়াবহ ভবিষ্যৎ এড়াতে এখনই যা করতে হবে: বাংলাদেশের করণীয় পদক্ষেপ
বাংলাদেশ যদি এখনই বৈশ্বিক এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে আগামী এক দশকের মধ্যে আমরা এক চরম মেধাহীন, অবসাদগ্রস্ত এবং মানসিকভাবে পঙ্গু তরুণ প্রজন্ম প্রত্যক্ষ করব। এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে আমাদের অবিলম্বে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
বয়স ভিত্তিক আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি: বিশ্ববাজারের আদলে বাংলাদেশেও অনূর্ধ্ব ১৫ বা ১৬ বছর বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খোলার ওপর জাতীয় আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে। মোবাইল সিম কার্ড বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশনের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্মনিবন্ধন সনদের ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপের বাধ্যবাধকতা: দেশে বাজারজাতকৃত প্রতিটি স্মার্টফোনে এবং ইন্টারনেট ব্রাউজারে সরকারি নির্দেশনায় ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ সিস্টেম এবং চাইল্ড ফিল্টার বিল্ট-ইন রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে শিশুরা চাইলেও কোনো অ্যাডাল্ট বা ক্ষতিকর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে না পারে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা ও প্রযুক্তিমুক্ত জোন: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের স্কুলগুলোতে মোবাইল ফোনের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং এবং সাইবার সচেতনতা বিষয়ক বিশেষ ক্লাসের আয়োজন করা জরুরি।
খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পুনরুজ্জীবন: ভার্চুয়াল দুনিয়া থেকে শিশুদের বের করে আনতে হলে তাদের বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নিশ্চিত করা, পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি গড়ে তোলা এবং শিশুদের চিত্রাঙ্কন, গান বা খেলাধুলার মতো সৃজনশীল ও শারীরিক পরিশ্রমের কাজে ব্যস্ত রাখা মা-বাবা ও সমাজের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
সোশ্যাল মিডিয়ার এই মায়াজাল আসলে এক ধরণের আধুনিক ‘ডিজিটাল কোকেন’, যা আমাদের অজান্তেই শিশুদের শৈশবকে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ২০টিরও বেশি দেশের এই নিষেধাজ্ঞা আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্য, মানবসভ্যতা বা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করার জন্য নয়। সরকার, সমাজ এবং পরিবার—এই তিন স্তরের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া আমাদের শিশুদের এই ভার্চুয়াল বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কঠোর আইন প্রণয়নে এগিয়ে আসতে হবে এবং মা-বাবাদের সচেতন হতে হবে। স্ক্রিনের নীল আলো নিভিয়ে আমাদের শিশুদের আবার ভোরের আলো, খোলা আকাশ আর সবুজ খেলার মাঠে ফিরিয়ে দেওয়ার এখনই চূড়ান্ত সময়।