Home খেলাধুলা হ্যালন্ডের হুংকার, নেইমারের কান্না: ব্রাজিলকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে

হ্যালন্ডের হুংকার, নেইমারের কান্না: ব্রাজিলকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে

0
হ্যালন্ডের হুংকার, নেইমারের কান্না: ব্রাজিলকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে
বিদায়ের বেদনায় নীল সেলেসাওরা; নরওয়ের কাছে হেরে মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নেইমার, ভিনিসিয়াসরা।

স্পোর্টস ডেস্ক, পাবনা নিউজ ২৪:

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এবং মহানাটকীয় এক ইতিহাসের সাক্ষী হলো ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। নকআউট পর্বের প্রথম ধাপে, অর্থাৎ ‘রাউন্ড অব ১৬’ (শেষ ১৬)-এর হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ গোলে স্তব্ধ করে দিয়েছে ইউরোপের উদীয়মান শক্তি নরওয়ে। এই ঐতিহাসিক জয়ের মাধ্যমে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার গৌরব অর্জন করেছে ভাইকিংরা। অন্যদিকে, এই চরম পরাজয়ে ১৯৯০ সালের পর বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে নিজেদের সবচেয়ে দ্রুততম বিদায়ের শোকে ও লজ্জায় ভাসছে ল্যাটিন আমেরিকার পরাশক্তিরা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে নরওয়ের হয়ে জয়ের একমাত্র নায়ক ছিলেন ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং ব্রাউট হ্যালন্ড। তার করা জোড়া গোলেই মূলত হেক্সা মিশনের স্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে সেলেসাওদের।

প্রথমার্ধে সাম্বার ছন্দে নরওয়েজীয় প্রাচীর

ম্যাচের শুরু থেকেই নিউ জার্সির গ্যালারিকে হলুদ সমুদ্রে পরিণত করেছিল ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা। প্রত্যাশা অনুযায়ী, রেফারি বাঁশি বাজানোর পর থেকেই বল পজিশন ধরে রেখে চেনা সাম্বার ছন্দে আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিতে শুরু করে ব্রাজিল। মাঝমাঠে লুকাস পাকেতা এবং ব্রুনো গিমারেসের চমৎকার পাসিং এবং উইংয়ে ভিনিসিয়াস জুনিয়র ও রদ্রিগোর গতি নরওয়ের ডিফেন্স লাইনে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ম্যাচের প্রথম ২০ মিনিটে গোলের অন্তত তিনটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছিল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা।তবে নরওয়ের রক্ষণভাগ এবং তাদের গোলরক্ষক যেন আজ চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বিশেষ করে রদ্রিগোর একটি জোরালো শট অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন নরওয়েজীয় গোলরক্ষক। প্রথমার্ধের পুরোটা সময় ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে গোলবঞ্চিত রাখতে সক্ষম হয় নরওয়ের কড়া ট্যাকলিং ও রক্ষণাত্মক কৌশল। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে দুই-একবার আর্লিং হ্যালন্ডের কাছে বল পৌঁছালেও ব্রাজিলের ডিফেন্ডার মার্কুইনহোস প্রথমার্ধে তাকে বোতলবন্দী করে রাখেন। ফলে গোলশূন্য অবস্থায় প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার পর ম্যাচটি এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির দিকে মোড় নেয়।

দ্বিতীয়ার্ধে ট্যাকটিক্যাল লড়াই ও হ্যালন্ড ম্যাজিক

বিরতির পর দ্বিতীয়ার্ধে মাঠের কৌশল পুরোপুরি বদলে ফেলেন নরওয়ের কোচ। তারা শুধুমাত্র নিজেদের বক্সে রক্ষণ করার নীতি থেকে সরে এসে মাঝমাঠে ব্রাজিলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। খেলার গতি যত বাড়ছিল, ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ততটাই খেই হারানোর লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছিল। একের পর এক মিস পাস এবং ফরোয়ার্ড লাইনের ফিনিশিংয়ের অভাবে ম্যাচটি ধীরে ধীরে ব্রাজিলের হাত থেকে ফস্কে যেতে থাকে।

দীর্ঘক্ষণ ব্রাজিলের অল-আউট আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখার পর কাউন্টার অ্যাটাকে যায় নরওয়ে। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে আসে সেই মহেন্দ্রক্ষণ, যা পুরো স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেয়। মাঝমাঠ থেকে নরওয়েজীয় মিডফিল্ডার মার্টিন ওডেগার্ডের পা থেকে আসা একটি নিখুঁত ও দূরদর্শী থ্রু পাস ধরে ডিফেন্ডারদের গতিতে পরাস্ত করেন আর্লিং হ্যালন্ড। ব্রাজিলের গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার পজিশন ছেড়ে সামনে এগিয়ে এলেও তাকে কোনো সুযোগ না দিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এক নিখুঁত কোনাকুনি শটে বল ব্রাজিলের জালে জড়ান হ্যালন্ড (১-০)। স্টেডিয়ামের এক প্রান্তে থাকা মুষ্টিমেয় নরওয়েজীয় ভক্তদের চিৎকারে তখন মেটলাইফ স্টেডিয়াম প্রকম্পিত।

ব্রাজিলের মরিয়া চেষ্টা এবং কফিনে শেষ পেরেক

এক গোলে পিছিয়ে পড়ে সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে ব্রাজিল। কোচ মাঠের সাইডলাইন থেকে অল-আউট আক্রমণের নির্দেশ দেন। এন্ড্রিক এবং গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলিকে মাঠে নামিয়ে আক্রমণের ধার বাড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। কিন্তু নরওয়ের শারীরিকভাবে শক্তিশালী ডিফেন্ডারদের সাথে পেরে উঠছিল না ব্রাজিলের তরুণ ফরোয়ার্ডরা। সমতা ফেরানোর এই অতি-আক্রমণাত্মক কৌশলের কারণে ব্রাজিলের রক্ষণভাগ পুরোপুরি অরক্ষিত হয়ে পড়ে।আর এই সুবর্ণ সুযোগটি হাতছাড়া করেননি বিশ্বসেরা স্ট্রাইকার হ্যালন্ড। ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে, অর্থাৎ ৯০ মিনিটে ব্রাজিলের ডিফেন্সের ফাঁকা জায়গার সুযোগ নিয়ে একক দক্ষতায় বল কেড়ে নেন তিনি। মার্কুইনহোসকে গতির ছন্দে ছিটকে দিয়ে ডি-বক্সের ঠিক ওপর থেকে বুলেট গতির শটে নিজের ও দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন এই ভাইকিং দানব (২-০)। এই গোলের সাথে সাথেই নিশ্চিত হয়ে যায় ব্রাজিলের বিদায় এবং নরওয়ের ঐতিহাসিক জয়।

ইনজুরি টাইমে নেইমারের সান্ত্বনা ও মাঠজুড়ে কান্না

দ্বিতীয়ার্ধের ফাউল এবং ইনজুরির কারণে রেফারি ম্যাচটিতে ১০ মিনিট ইনজুরি টাইম যোগ করেন। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে, অর্থাৎ ৯০+১০ মিনিটে ডি-বক্সের ভেতর ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে ফাউল করার সুবাদে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। স্পট কিক থেকে দলের হয়ে একমাত্র সান্ত্বনাসূচক গোলটি করেন ইনজুরি কাটিয়ে এই বিশ্বকাপেই দলে ফেরা পোস্টার বয় নেইমার জুনিয়র (২-১)। তবে এই গোলটি কেবল ব্রাজিলের হারের ব্যবধানই কমিয়েছে, বিদায়ের ক্ষত ঢাকতে পারেনি। নেইমারের গোলের পর রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজান, তখন মাঠের ওপর আছড়ে পড়ে এক বেদনাবিধুর দৃশ্য। রেফারির বাঁশির সাথে সাথেই মাঠে হাঁটু গেড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নেইমার, ভিনিসিয়াস, রদ্রিগোসহ পুরো ব্রাজিল দল। গ্যালারিতে লাখো ভক্তের চোখে তখন জল।

৩৬ বছর পর ব্রাজিলের এমন চরম বিপর্যয় ও হেক্সা স্বপ্নভঙ্গ

পরিসংখ্যানের পাতায় এই হার ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি কালো অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হলো। সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে শেষ ১৬-তে হেরে এতো দ্রুত বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। এরপর দীর্ঘ ৩৬ বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে আবারো নকআউট পর্বের প্রথম ধাপেই বিদায় নিতে হলো তাদের। এই লজ্জাজনক হারের ফলে ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের (হেক্সা মিশন) স্বপ্ন আরও একবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ২০০২ সালের পর থেকে ইউরোপীয় দলগুলোর বিপক্ষে নকআউট পর্বে ব্রাজিলের ব্যর্থতার যে সিলসিলা, তা এই ম্যাচেও বজায় রইল।

অন্যদিকে, দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করেই বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের আগমন বার্তা জানান দিল নরওয়ে। আর্লিং হ্যালন্ডের দানবীয় পারফরম্যান্স এবং মার্টিন ওডেগার্ডের চতুর অধিনায়কত্বে ভর করে তারা এখন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের এই অপ্রতিরোধ্য রূপ ধরে রাখতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here