নিউজ ডেস্ক || পাবনা নিউজ ২৪
৮ জুলাই, ২০২৬
সকাল হতেই ল্যাপটপ খুলে লিংকডইন (LinkedIn), বিডিজবস কিংবা বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ক্যারিয়ার পেজে চোখ বোলানো এখন কোটি তরুণের প্রতিদিনের রুটিন। নিখুঁতভাবে তৈরি করা জীবনবৃত্তান্ত (CV) আর কভার লেটার নিয়ে শত শত পজিশনে আবেদন করার পর ইন্টারভিউয়ের ডাকও মিলছে। কিন্তু প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা ফাইনাল রাউন্ডের ইন্টারভিউ শেষ হওয়ার পর হঠাৎ করেই ওপার থেকে সব নীরব। কোনো রিজেকশন মেইল নেই, নেই কোনো আপডেট। কিছুদিন পর দেখা যায়, ঠিক একই পদের জন্য কোম্পানিটি আবারও নতুন করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।বর্তমান ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ও দেশীয় চাকরির বাজারে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং করপোরেট সংস্কৃতির এক অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা। মানবসম্পদ (HR) ও ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞরা এই প্রপঞ্চটিকে নাম দিয়েছেন ‘ঘোস্ট জবস’ (Ghost Jobs) বা ‘অদৃশ্য চাকরি’। সহজ কথায়, যেসব পদের বিপরীতে আসলে কোনো প্রকৃত নিয়োগের উদ্দেশ্য নেই, অথচ মাসের পর মাস ইন্টারনেটে সার্কুলার ঝুলিয়ে রাখা হয়, সেগুলোই হলো ঘোস্ট জবস। এই কৃত্রিম শূন্যতার ফাঁদে পড়ে লাখ লাখ যোগ্য চাকরিপ্রার্থী চরম মানসিক ট্রমা ও হতাশার শিকার হচ্ছেন।
‘ঘোস্ট জবস’ আসলে কী এবং এর বিস্তৃতি কতটুকু?
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন এইচআর ফোরামের ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে লিংকডইন বা গ্লাসডোরের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে পোস্ট হওয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তির প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই আসলে ‘ভুয়া’ বা অস্তিত্বহীন। অর্থাৎ কোম্পানিগুলোর এই মুহূর্তে সেই পদে লোক নেওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই।অনেকে ভাবতে পারেন, এটি হয়তো কেবল উন্নত বিশ্বের সমস্যা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের আইটি সেক্টর, ব্যাংকিং খাত এবং বিভিন্ন স্টার্টআপ কোম্পানিতেও এই কালচার এখন সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে চাকরিপ্রার্থীরা তাদের মূল্যবান সময়, এনার্জি এবং আবেগ খরচ করে এমন এক অদৃশ্য মৃগয়াঙ্গনে ছুটছেন, যার শেষ প্রান্তে আসলে কোনো প্রাপ্তি নেই।
কেন কোম্পানিগুলো এই অদৃশ্য ফাঁদ তৈরি করে?
কোনো পদে লোকবল নিয়োগ না করেও কেন কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত বিজ্ঞপ্তির পেছনে টাকা ও সময় খরচ করে? এর পেছনে রয়েছে করপোরেট হিউম্যান রিসোর্সের অত্যন্ত সুচতুর কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যবসায়িক সমীকরণ:
কৃত্রিম প্রবৃদ্ধি ও ব্র্যান্ড ভ্যালু প্রদর্শন: শেয়ার বাজার, বিনিয়োগকারী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোর কাছে নিজেদের অত্যন্ত সফল ও দ্রুত বর্ধনশীল হিসেবে জাহির করার অন্যতম উপায় হলো নিয়মিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় কোম্পানিটি দারুণ লাভ করছে এবং প্রচুর নতুন লোক নিচ্ছে, যা আসলে তাদের ব্র্যান্ড ইমেজ ও ভ্যালু কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখে।
বর্তমান কর্মীদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি: করপোরেট ম্যানেজমেন্ট অনেক সময় বর্তমান কর্মীদের বোঝাতে চায়, “তোমাদের বিকল্প বাজারে তৈরি আছে।” যদি কোনো কর্মী অতিরিক্ত কাজের চাপ বা বেতন নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে, তখন এই ঝুলন্ত সার্কুলারগুলো দেখিয়ে তাদের নীরবে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়।
ভবিষ্যতের জন্য ‘সিভি ব্যাংক’ তৈরি: অনেক সময় কোম্পানিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে লোক না নিলেও, বাজারের সেরা ট্যালেন্টদের জীবনবৃত্তান্ত নিজেদের ডাটাবেজে জমা রাখতে চায়। যাতে ভবিষ্যতে হঠাৎ কেউ চাকরি ছেড়ে দিলে দ্রুত ব্যাকআপ পাওয়া যায়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় যে আবেদনকারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার মানসিক যন্ত্রণা পোহাতে হয়, তা কোম্পানিগুলো আমলে নেয় না।
বেকারদের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও সামাজিক সংকট
ঘোস্ট জবসের এই নোংরা খেলাটি সবচেয়ে বড় আঘাত হানছে তরুণ ও ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। মাসের পর মাস যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ইন্টারভিউ দিয়েও যখন কোনো রেসপন্স পাওয়া যায় না, তখন চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের ওপর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। তারা নিজেদের অযোগ্য ভাবতে শুরু করেন, যা তীব্র বিষণ্ণতা (Depression), সোশ্যাল আইসোলেশন এবং চরম আত্মবিদ্বেষের জন্ম দেয়।ঘোস্ট জবসের কারণে সৃষ্ট ৩টি প্রধান সামাজিক সংকট: ১. মেধা পাচার (Brain Drain): দেশের করপোরেট সংস্কৃতির ওপর ক্ষোভ থেকে তরুণরা দলে দলে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ২. ক্যারিয়ারে স্থবিরতা: ইন্টারভিউয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পেছনে সময় নষ্ট করতে করতে তরুণদের আসল কর্মক্ষম বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। ৩. উদ্যোক্তা হওয়ার ভীতি: চাকরির বাজারের এই অনিশ্চয়তা দেখে অনেকেই নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়ার ঝুঁকি নিতেও ভয় পাচ্ছেন।
ভুক্তভোগী এক তরুণীর বয়ান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থী জানান, “আমি গত চার মাসে একটি নামী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের তিনটি ধাপে ইন্টারভিউ দিয়েছি। তারা আমার কাছ থেকে পুরো একটি মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি প্রজেক্টও করিয়ে নিয়েছে। এরপর তারা সম্পূর্ণ নীরব। গত সপ্তাহে দেখলাম, তারা আবার লিংকডইনে একই পদে নতুন অ্যাপ্লিকেশনের জন্য সার্কুলার দিয়েছে। মনে হলো, আমার আইডিয়াগুলো ফ্রিতে নেওয়ার জন্যই তারা এই ইন্টারভিউয়ের নাটক করেছিল।”
কীভাবে চিনবেন এই ‘অদৃশ্য চাকরি’ বা ঘোস্ট জবস?
চাকরির বাজারের এই সুচতুর প্রতারণা থেকে বাঁচতে চাকরিপ্রার্থীদের নিজেদের সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কোনো বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করার আগে নিচের লক্ষণগুলো খেয়াল করুন:
অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলন্ত সার্কুলার: যদি দেখেন কোনো চাকরির বিজ্ঞপ্তি ৩০ দিনের বেশি সময় ধরে অ্যাক্টিভ আছে বা প্রতিনিয়ত ‘রি-পোস্ট’ করা হচ্ছে, তবে বুঝতে হবে এটি ঘোস্ট জব হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
অস্পষ্ট কাজের বিবরণী (JD): যেসব বিজ্ঞপ্তিতে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বা যোগ্যতার কথা না লিখে অত্যন্ত সাধারণ বা ধোঁয়াশাপূর্ণ কথা লেখা থাকে, সেগুলো মূলত ডাটা সংগ্রহের ফাঁদ।
প্রতিনিয়ত একই পদের বিজ্ঞাপন: কোনো কোনো কোম্পানি সারা বছরই নির্দিষ্ট কিছু পদে ‘জরুরি নিয়োগ’ দিয়ে রাখে। একটু খোঁজ নিলেই জানা যায়, ওই পদে আসলে গত এক বছরে কাউকেই চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
শেষ কথা
চাকরির বাজার সবসময়ই প্রতিযোগিতাপূর্ণ, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত স্বচ্ছ এবং সৎ। করপোরেট সেক্টরের এই ‘ঘোস্ট জবস’ কালচার কেবল মেধার অপচয় করছে না, বরং একটি পুরো প্রজন্মের বিশ্বাস ও উদ্দীপনা ভেঙে দিচ্ছে। নীতিনির্ধারক ও বাফুফে বা সরকারি শ্রম মন্ত্রণালয়ের মতো সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত জব পোর্টালগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি আনা, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো পদে প্রকৃত শূন্যতা ছাড়া কৃত্রিম সার্কুলার দিয়ে তরুণদের আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে।