Home বিশ্ব ভেনিজুয়েলায় প্রলয়ঙ্কারী জোড়া ভূমিকম্পের ক্ষত: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪,৩৩৩, ধ্বংসস্তূপে এখনো চলছে জীবনের সন্ধান

ভেনিজুয়েলায় প্রলয়ঙ্কারী জোড়া ভূমিকম্পের ক্ষত: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪,৩৩৩, ধ্বংসস্তূপে এখনো চলছে জীবনের সন্ধান

0
ভেনিজুয়েলায় প্রলয়ঙ্কারী জোড়া ভূমিকম্পের ক্ষত: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪,৩৩৩, ধ্বংসস্তূপে এখনো চলছে জীবনের সন্ধান
ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া একটি বহুতল আবাসিক ভবনের বিশাল ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে স্বজন হারানোর বেদনায় স্তব্ধ পরিবার, যেখানে এখনো নিখোঁজদের উদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছেন জরুরি উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা।

নিউজ ডেস্ক ,পাবনা নিউজ ২৪

দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলায় গত মাসে আঘাত হানা স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ও শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এবং হতাহতের এক নতুন ও হৃদয়বিদারক তালিকা প্রকাশ করেছে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। সর্বশেষ পাওয়া সরকারি দাপ্তরিক তথ্য এবং উদ্ধারকারী দলগুলোর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,৩৩৩ জনে। একই সাথে এই প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পে গুরুতর আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে একটি বড় অংশই শিশু এবং নারী। মাটির সাথে মিশে যাওয়া বহুতল ভবন, হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বহু মানুষ, যার ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভূমিকম্পের পর প্রায় এক মাস পার হয়ে গেলেও লাতিন আমেরিকার এই দেশটিতে এখনো কাঁপন থামেনি; হাজার হাজার পরিবার তাদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়স্থলটুকু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে (ক্যাম্পে) চরম অমানবিক ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় এই মানবিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে ভেনিজুয়েলা সরকার দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি মানবিক ও চিকিৎসা সহায়তার জোরালো আবেদন জানিয়েছে।

জোড়া ভূমিকম্পের সেই কালরাত: যেভাবে মাটির সাথে মিশে গেল সাজানো শহর

গত মাসের এক অভিশপ্ত মাঝরাতে যখন ভেনিজুয়েলার সাধারণ মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পরপর দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূকম্পন বা ‘টুইন আর্থকোয়েক’ পুরো দেশকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। প্রথম ভূমিকম্পটির রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৭.৫, যার উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায়। এর ঠিক দুই ঘণ্টার মাথায় যখন মানুষ আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় নেমে আসে এবং উদ্ধারকাজ শুরু হয়, তখনই আঘাত হানে ৭.২ মাত্রার দ্বিতীয় প্রলয়ঙ্কারী আফটারশকটি। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এই জোড়া ভূকম্পনের গভীরতা কম থাকায় এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ছিল সাধারণ ভূমিকম্পের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি, যা মুহূর্তের মধ্যে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের উপকণ্ঠসহ বেশ কয়েকটি প্রধান শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই কম্পনে বড় বড় সড়কগুলোতে বিশাল ফাটল দেখা দেয়, ভেঙে পড়ে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, এবং গ্যাস পাইপলাইন ফেটে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মাত্র কয়েক মিনিটের তাণ্ডবে চোখের সামনে বহুতল আবাসিক ভবনগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে দেখা যায়, যা আধুনিক ভেনিজুয়েলার ইতিহাসে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

উদ্ধারকাজের করুণ চিত্র: ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো চলছে অলৌকিক জীবনের সন্ধান

ভূমিকম্পের পর চার সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ভেনিজুয়েলার আক্রান্ত শহরগুলোতে উদ্ধার অভিযান এখনো পুরোদমে চলছে, যদিও সময় গড়ানোর সাথে সাথে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত মানুষ উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনী, স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের বিশেষায়িত দলগুলো দিনরাত এক করে ভারী যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরের সাহায্যে ধসে পড়া কংক্রিটের চাঁই সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ করে যাচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, এখনো অনেক ধসে পড়া ভবনের বেজমেন্ট থেকে দুর্বল আর্তনাদ বা দেওয়ালে আঘাত করার শব্দ শোনা যাচ্ছে, যা উদ্ধারকারীদের মনে অলৌকিক কোনো প্রাণের সন্ধান পাওয়ার আশা জাগিয়ে রাখছে। তবে ধ্বংসস্তূপের বিশালতা, টানা বৃষ্টিপাত এবং বারবার মৃদু আফটারশকের কারণে উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা উদ্ধারকর্মীদের জীবনকেও প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই; করিডোর থেকে শুরু করে খোলা মাঠে তাঁবু খাটিয়ে আহত ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষের জরুরি চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে, যেখানে চিকিৎসকের অভাব এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধের তীব্র সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

অস্থায়ী ক্যাম্পের রূঢ় বাস্তবতা: খোলা আকাশের নিচে লাখো মানুষের মানবেতর জীবন

ভূমিকম্পের তীব্রতায় ভেনিজুয়েলার প্রায় লক্ষাধিক ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে রাতারাতি গৃহহীন হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। দেশটির সরকার এবং আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত স্টেডিয়াম, পার্ক এবং খোলা মাঠে হাজার হাজার অস্থায়ী ক্যাম্প বা ট্রানজিট ক্যাম্প স্থাপন করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। এই অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতে বর্তমানে তীব্র সুপেয় পানির সংকট, স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাব এবং পুষ্টিকর খাদ্যের হাহাকার দেখা দিয়েছে, যা রিফিউজিদের জীবনকে এক চরম নরককুণ্ডে পরিণত করেছে। বিশেষ করে আশ্রয় শিবিরগুলোতে অবস্থান নেওয়া হাজার হাজার শিশু এবং প্রবীণ নাগরিকেরা নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং চর্মরোগসহ বিভিন্ন ধরণের সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা একটি নতুন স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে। অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদের দুবেলা পেট ভরে খাবার দিতে পারছেন না, আবার অন্যদিকে তীব্র শীত ও ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে পাতলা প্লাস্টিকের তাঁবুর নিচে রাত কাটাতে হচ্ছে তাদের। ঘরবাড়ি হারানোর মানসিক ট্রমা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে আশ্রয় শিবিরগুলোতে এক গভীর মানবিক হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক সাহায্যের আকুল আবেদন

এমনিতেই ভেনিজুয়েলা গত কয়েক বছর ধরে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল; তার ওপর এই জোড়া ভূমিকম্প দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতিকে একবারে মেরুদণ্ডহীন করে দিয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে জানা গেছে, এই দুর্যোগের ফলে দেশের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা পুনর্নির্মাণ করা ভেনিজুয়েলা সরকারের একার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দেশটির প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অবিলম্বে ঋণ মওকুফ, জরুরি শিশুখাদ্য, তাবু, কম্বল এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠানোর জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে জাতিসংঘ (UN), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বেশ কয়েকটি বন্ধুভাবাপন্ন দেশ ভেনিজুয়েলার জন্য বিশেষ জরুরি তহবিল ও ত্রাণ সামগ্রী পাঠাতে শুরু করেছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় সাগরে এক ফোঁটা পানির মতো। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভেনিজুয়েলাকে এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে টেনে তুলতে হলে এবং ক্ষতিগ্রস্ত লাখো মানুষকে পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হলে বিশ্বনেতাদের রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে এক দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত বৈশ্বিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

ভেনিজুয়েলার এই প্রলয়ঙ্কারী জোড়া ভূমিকম্প আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে মানুষের তৈরি আধুনিক সভ্যতা কতটা অসহায়। ৪,৩৩৩ টি তাজা প্রাণের অকাল মৃত্যু এবং ১৬ হাজার মানুষের পঙ্গুত্বের এই করুণ মহাকাব্য কেবল লাতিন আমেরিকার একটি দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো মানবজাতির জন্য এক গভীর শোকের বার্তা। ভেনিজুয়েলার এই ক্ষত সহজে শুকানোর নয়, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিঃস্বার্থ সহযোগিতা এবং দেশটির মানুষের লড়াকু মানসিকতাই পারে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আবারো নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখতে। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ঘনঘটার যুগে ভেনিজুয়েলার এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিটি দেশেরই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বহুতল ভবন নির্মাণে আরও বেশি সতর্ক ও আধুনিক প্রযুক্তি বান্ধব হওয়া জরুরি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here