নিউজ ডেস্ক ,পাবনা নিউজ ২৪
ভ্রমণপিয়াসী মানুষ যখনই আন্তর্জাতিক ভ্রমণের কথা ভাবেন, তখনই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালা, প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কিংবা বালির সমুদ্র সৈকত। কিন্তু এই চেনা পৃথিবীর চেনা স্পটগুলোর বাইরেও এশিয়া মহাদেশের ঠিক বুকেই লুকিয়ে আছে এমন এক অনন্য ও অফবিট ট্রাভেল ডেস্টিনেশন, যার রূপ ও রহস্য যেকোনো মানুষকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। মধ্য এশিয়ার দেশ তাজিকিস্তানের সুউচ্চ পামির মালভূমি ও ফ্যান পর্বতমালার (Fann Mountains) মাঝে লুকিয়ে থাকা তেমনই এক পৃথিবীর গোপন রত্ন হলো ‘লেক ইস্কান্দারকূল’ (Lake Iskanderkul)। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,১৯৫ মিটার (৭,২০০ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত এই হ্রদটি কেবল তার গাঢ় নীল জল আর চারপাশের ধূসর-সবুজ পাহাড়ের জন্যই বিখ্যাত নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম মহানায়ক মহামতি আলেকজান্ডারের এক প্রাচীন রহস্যময় ইতিহাস। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে যারা গতানুগতিক কমার্শিয়াল পর্যটন কেন্দ্র ছেড়ে একদম শান্ত, নির্জন ও রোমাঞ্চকর এক অপার্থিব স্বর্গের সন্ধান করছেন, তাদের ট্রাভেল বাকেট লিস্টের শীর্ষে থাকা উচিত এই অনিন্দ্যসুন্দর স্পটটি।
পাবনা নিউজ ২৪-এর পাঠকদের জন্য পৃথিবীর এই অন্যরকম এক বিস্ময় এবং তার সম্পূর্ণ ভ্রমণ গাইড নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আন্তর্জাতিক ট্যুরিজম ফিচার।
নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা আলেকজান্ডারের রহস্যময় ইতিহাস
‘ইস্কান্দারকূল’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো—“আলেকজান্ডারের হ্রদ”। মধ্য এশিয়ায় মহামতি আলেকজান্ডারকে (Alexander the Great) ‘ইস্কান্দার’ নামে ডাকা হতো, আর ‘কূল’ শব্দের অর্থ হ্রদ। স্থানীয় পার্সিয়ান লোকগাথা ও ইতিহাস অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে ভারত অভিযানের পথে মহান আলেকজান্ডার তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে এই হ্রদের পাড়েই তাঁবু ফেলেছিলেন।
এই হ্রদটিকে নিয়ে একটি চমৎকার লোককথা প্রচলিত আছে। বলা হয়, আলেকজান্ডারের প্রিয় ঘোড়া ‘বুকেফালাস’ (Bucephalus) এই হ্রদের পাড়ে অবস্থানকালে অসুস্থ হয়ে মারা যায় অথবা হ্রদের পানিতে তলিয়ে যায়। স্থানীয় পামির উপজাতির মানুষেরা এখনো বিশ্বাস করেন, প্রতি পূর্ণিমার রাতে হ্রদের শান্ত ও নীল জল চিরে আলেকজান্ডারের সেই বিশ্বস্ত ঘোড়াটি বাইরে বেরিয়ে আসে এবং হ্রদের পাড়ে ঘাস খেয়ে আবার ভোরের আলো ফোটার আগে পানির নিচে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ঐতিহাসিক রহস্য ও লোকগাথা লেক ইস্কান্দারকূলকে সারা বিশ্বের অফবিট ট্রাভেলারদের কাছে এক রোমাঞ্চকর আকর্ষণে পরিণত করেছে।
রূপের ম্যাজিক: কেন এটি পৃথিবীর অন্যতম ইউনিক হ্রদ?
লেক ইস্কান্দারকূলের মূল আকর্ষণ হলো এর পানির রঙ এবং চারপাশের অবিশ্বাস্য ভৌগোলিক গঠন। এই হ্রদের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:
রঙ বদলানো জলরাশি: এই হ্রদের পানির রঙ কোনো নির্দিষ্ট একটি রঙের নয়। দিনের আলোর ওপর নির্ভর করে এটি তার রূপ পরিবর্তন করে। সকালে যখন সূর্যের আলো প্রথম পাহাড়ে পড়ে, তখন পানি থাকে একদম হালকা ফিরোজা (Turquoise) রঙের। দুপুরে তা রূপ নেয় গাঢ় পান্না সবুজে এবং রোদ পড়ে যখন বিকেল নামার উপক্রম হয়, তখন পুরো হ্রদটি এক কালচে নীল চাদরে ঢাকা পড়ে যায়।
ফ্যান পর্বতমালার রুক্ষ সৌন্দর্য: হ্রদটিকে চারপাশ থেকে মুকুটের মতো ঘিরে রেখেছে প্রকাণ্ড ও রুক্ষ ফ্যান পর্বতমালা। তুষারাবৃত চূড়া আর ধূসর পাহাড়ের মাঝখানে এই বিশাল নীল জলের হ্রদটি দেখতে ঠিক যেন মরূদ্যানের মতো লাগে।
তাজিকিস্তানের ‘নায়াগ্রা’ ঝরনা: এই হ্রদের একদম পাশেই রয়েছে প্রায় ৩৮ মিটার উঁচু একটি প্রকাণ্ড পাহাড়ী ঝরনা, যাকে স্থানীয়রা ‘তাজিকিস্তানের নায়াগ্রা’ বলে ডাকেন। হ্রদের পানি উপচে এই ঝরনাটি সরু গিরিপথ দিয়ে নিচে নেমে গেছে, যার গর্জন বহুদূর থেকে শোনা যায়।
অ্যাডভেঞ্চার লাভারদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য: এখানে কী কী করবেন?
ইস্কান্দারকূল কেবল ছবি তোলার জায়গা নয়, এটি প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার এক দুর্দান্ত থিয়েটার:
পাহাড়ী ট্রেকিং ও হাইকিং: ফ্যান পর্বতমালার এই অঞ্চলটি হাইকারদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। হ্রদের পাড় থেকে শুরু করে ওপরের দিকে বেশ কয়েকটি চমৎকার ট্রেকিং রুট রয়েছে, যেখান থেকে পুরো হ্রদের প্যানোরামিক ভিউ দেখা যায়।
নৌকাভ্রমণ ও ক্যাম্পিং: হ্রদের শান্ত পানিতে স্পিডবোট বা সাধারণ নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো যায়। এছাড়া হ্রদের পাড়ে তাবু খাটিয়ে ক্যাম্পিং করার অভিজ্ঞতা সারাজীবন মনে রাখার মতো। রাতের মেঘমুক্ত আকাশে যখন পামির মালভূমির ওপর কোটি কোটি তারা জ্বলে ওঠে, সেই ছায়াপথ বা মিল্কিওয়ে দেখার অভিজ্ঞতা এক কথায় অনির্বচনীয়।
স্নেক লেক বা সাপের হ্রদ ভ্রমণ: ইস্কান্দারকূলের ঠিক পাশেই রয়েছে ছোট আরেকটি হ্রদ, যার নাম ‘স্নেক লেক’। এখানকার পানির তাপমাত্রা মূল হ্রদের চেয়ে বেশি হওয়ায় এখানে প্রচুর জলজ সাপ দেখা যায়, যা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের বেশ টানে।
কীভাবে যাবেন এবং সেরা সময় কোনটি?
তাজিকিস্তানের এই রত্নটি দেখার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস (গ্রীষ্মকাল)। কারণ শীতকালে (নভেম্বর থেকে মার্চ) এই পুরো অঞ্চলটি প্রচণ্ড বরফে ঢেকে যায় এবং তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যাওয়ার ফলে রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। গ্রীষ্মকালে এখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত মনোরম ও স্নিগ্ধ থাকে।
যাতায়াত গাইড:
বাংলাদেশ থেকে প্রথমে বিমানে করে তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবে (Dushanbe) পৌঁছাতে হবে। দুশানবে শহর থেকে লেক ইস্কান্দারকূলের দূরত্ব মাত্র ১৩০ কিলোমিটার। তবে রাস্তাটি পামির হাইওয়ের আঁকাবাঁকা ও দুর্গম পাহাড়ী পথ হওয়ায় একটি ফোর-হুইল ড্রাইভ (4×4 SUV) গাড়ি ভাড়া করে যেতে সময় লাগবে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। যাত্রাপথের আনঝব টানেল (Anzob Tunnel) পার হওয়ার অভিজ্ঞতাও আপনার ভ্রমণে এক নতুন রোমাঞ্চ যোগ করবে।
পৃথিবীর চেনা সব আধুনিক ও কৃত্রিম পর্যটন স্পটের ভিড়ে তাজিকিস্তানের ‘লেক ইস্কান্দারকূল’ যেন এক আদিম, অস্পৃশ্য ও খাঁটি প্রকৃতির উদাহরণ। যেখানে কোনো কোলাহল নেই, নেই যান্ত্রিক শহরের দূষণ; আছে কেবল পাহাড়ের নীরবতা, আলেকজান্ডারের ইতিহাস আর শান্ত নীল জলের মায়াবী ডাক। আপনি যদি নিজেকে একজন প্রকৃত ট্রাভেলার বা ভ্রমণপিয়াসী মনে করেন এবং পৃথিবীর বুকে এক লুকিয়ে থাকা রূপকথার রাজ্যের অভিজ্ঞতা নিতে চান, তবে জীবনের কোনো এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে পামির মালভূমির এই গোপন নীল স্বর্গে আপনার পা রাখা উচিত।