Home ধর্ম ও জীবন ইছামতীর তীরে বিশ্বাসের সুর: পাবনার মাটিতে সম্প্রীতির এক অনন্য উপাখ্যান

ইছামতীর তীরে বিশ্বাসের সুর: পাবনার মাটিতে সম্প্রীতির এক অনন্য উপাখ্যান

0
ইছামতীর তীরে বিশ্বাসের সুর: পাবনার মাটিতে সম্প্রীতির এক অনন্য উপাখ্যান
আজানের সুর আর শাঁখের আওয়াজ যেখানে এক হয়ে মিশে যায় ইছামতীর বাতাসে! শত বছরের ঐতিহ্য আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য জনপদ আমাদের পাবনা। ধর্মের মেলবন্ধনে ঘেরা এই শহরের ভালোবাসার গল্পটি

লাইফস্টাইল ও সমাজ ভাবনা ডেস্ক, পাবনানিউজ২৪: হেমন্তের কোনো এক শান্ত বিকেলে কিংবা বসন্তের মায়াবী সন্ধ্যায় যদি আপনি পাবনা শহরের আব্দুল হামিদ রোড ধরে একটু হেঁটে যান, তবে একটা অদ্ভুত সুন্দর সুর আপনার কানে আসবে। একদিকে রামচন্দ্রপুর বা রাধানগরের কোনো মন্দির থেকে ভেসে আসছে সন্ধ্যারতির শাঁখের আওয়াজ, আর ঠিক তার পরমুহূর্তেই শহরের কোনো এক মসজিদ থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে মাগরিবের সুমধুর আজানের ধ্বনি।

কোনো এক জাদুকরী শক্তিতে এই দুটি ভিন্ন সুর ইছামতীর আকাশে এসে এক হয়ে যায়। এটাই আমাদের পাবনা। ধর্মের ভিন্নতা এখানে দেয়াল তোলেনি, বরং তৈরি করেছে এক সুদৃঢ় সেতুবন্ধন।

উৎসবের রঙে যখন এক হয় পুরো শহর

পাবনার মানুষের কাছে ধর্ম মানে শুধু আচার-অনুষ্ঠান নয়, ধর্ম মানে একে অপরের পাশে থাকা, আনন্দটা ভাগ করে নেওয়া। ঈদের সকালে যেমন চাটমোহর বা সুজানগরের কোনো মুসলিম বাড়িতে ফিরনি-সেমাইয়ের সুবাসে অমুসলিম বন্ধুরা এসে ভিড় জমায়, ঠিক তেমনি দুর্গাপূজার মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের আওয়াজে আর আরতির আলোয় শামিল হয় পুরো শহরের মুসলিম তরুণ-তরুণীরাও।

অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ আশ্রমের উৎসব হোক কিংবা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বড়দিন— পাবনাবাসী সবসময়ই প্রমাণ করেছে, “ধর্ম যার যার, উৎসব কিন্তু সবার।” উৎসবের দিনগুলোতে মণ্ডপে বা পাড়ার আড্ডায় কে কোন ধর্মের, সেই পরিচয়টা ঢাকা পড়ে যায় ‘আমরা পাবনার মানুষ’ এই একটিমাত্র পরিচয়ের নিচে।

লালন আর সুফিবাদের সেই চিরন্তন শিক্ষা

পাবনার মাটির গভীরে মিশে আছে সুফিবাদ আর বাউল দর্শনের এক পরম পরশ। এই অঞ্চলের মানুষ যুগ যুগ ধরে লালন শাহের অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর পীর-মাশায়েখদের শান্তির বাণী বুকে ধারণ করে বড় হয়েছে। তাই তো এ শহরের মানুষ খুব সহজ করেই বিশ্বাস করতে পারে যে, দিনশেষে সব মানুষের রক্তেরই রঙ লাল, আর সবার প্রার্থনার মূল লক্ষ্য একটাই— শান্তি ও মানবতা।

ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পাড়ার চায়ের দোকান— সবখানেই হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান ভাই ভাই হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। কোনো উসকানি বা সংকীর্ণতা কখনই এই শহরের বহু বছরের চেনা শান্তিকে ডালপালা মেলতে দেয়নি।

শহরের প্রবীণ এক বাসিন্দার স্মৃতিচারণ: > "আমাদের ছোটবেলায় দেখতাম, ঈদের দিন হিন্দু বন্ধুরা আমাদের বাড়ি না খেলে মায়ের মন ভরতো না। আবার পূজার সময় আমরা ওদের বাড়ি না গেলে ওরা রাগ করতো। আজ যুগের পরিবর্তন হয়েছে, ফেসবুক-ইন্টারনেটের জামানা এসেছে, কিন্তু আনন্দের সেই ভাগাভাগিটা পাবনার মাটি থেকে হারিয়ে যায়নি।"

পাবনানিউজ২৪-এর শেষ কথা

পাবনার আসল সৌন্দর্য শপিং মলের চাকচিক্য বা আধুনিকতায় নয়, এর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে মানুষের এই বিশ্বাসের গভীরে। ধর্ম এখানে মানুষকে দূরে ঠেলে দেয় না, বরং একে অপরকে ভালোবাসতে শেখায়। যুগে যুগে নানা পরিবর্তন আসলেও ইছামতীর তীরের এই সম্প্রীতির গল্প অবিনশ্বর থাকবে। বিশ্বাসের এই সুবাতাস এভাবেই বয়ে চলুক আমাদের প্রিয় পাবনার বুকে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here