দেশের বাজারে আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে সোনার বাজার। সব রেকর্ড ভেঙে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে পৌঁছেছে এই মূল্যবান ধাতু। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবী সোনার (পাকা সোনা) দাম বাড়ার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক লাফে প্রতি ভরি সোনার দাম বাড়ানো হয়েছে ৫,৪৮২ টাকা। এর ফলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে।আজ ২৭ জুন, ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন মূল্য তালিকা সাধারণ ক্রেতা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক সোনার বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনের মূল কারণগুলো।
এক নজরে সোনার নতুন দামের তালিকা
বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাজারে বিভিন্ন ক্যারেটের সোনার নতুন দাম নিচে দেওয়া হলো:
২২ ক্যারেট (হলমার্কযুক্ত): প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২,২৮,৫৫৬ টাকা। যা গতকাল পর্যন্ত ছিল ২,২৩,০৭৪ টাকা।
২১ ক্যারেট: প্রতি ভরির নতুন দাম ২,১৮,১৮০ টাকা।
১৮ ক্যারেট: প্রতি ভরি সোনার নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ১,৮৭,০১২ টাকা।
সনাতন পদ্ধতির সোনা: প্রতি ভরির নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১,৫৪,৫৮০ টাকা।
দ্রষ্টব্য: সোনার দামের এই পরিবর্তনের সাথে সরকারি ভ্যাট (৫%) এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম জুয়েলারি মজুরি (ভরি প্রতি ন্যূনতম ৩,৫০০ টাকা) যুক্ত হয়ে চূড়ান্ত খুচরা মূল্য নির্ধারিত হবে।
কেন এই আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি?
হঠাৎ করে দেশের বাজারে সোনার দাম এতটা বাড়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক উভয় বাজারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান কারণগুলো হলো:
বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংকট
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের ঊর্ধ্বগতি দেশের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে বাড়ছে স্বর্ণের আউন্সপ্রতি দাম।
স্থানীয় বাজারে তেজাবী সোনার সংকট
বাংলাদেশে সোনা আমদানির চেয়ে স্থানীয় ‘তেজাবী সোনা’ বা পুরনো সোনা গলিয়ে নতুন অলঙ্কার তৈরির প্রবণতা বেশি। বাজুসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে দেশের বাজারে তেজাবী সোনার সরবরাহ সংকটের কারণে এর দাম অনেক বেড়ে গেছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় দেশের বাজারে বাধ্য হয়েই দাম বাড়াতে হয়েছে।
ডলারের বিপরীতে টাকার মান হ্রাস
টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থানও এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সোনা বা এর কাঁচামাল আমদানি করতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের পকেটে।
জুয়েলারি শিল্প ও মধ্যবিত্তের ওপর প্রভাব
সোনার দাম ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় দেশের জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। সাধারণত জুন-জুলাই মাসের দিকে বিয়ের মৌসুম এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান বেশি থাকে। কিন্তু দামের এই আকাশচুম্বী উল্লম্ফনের কারণে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য বিয়ের গহনা কেনা এখন প্রায় সাধ্যের বাইরে চলে গেছে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের মতে, সোনার দাম বাড়লে তাদের বিক্রির পরিমাণ বা ‘ভলিউম’ মারাত্মকভাবে কমে যায়। ক্রেতারা এখন নতুন অলঙ্কার কেনার চেয়ে পুরনো সোনা পরিবর্তন বা বিক্রি করার দিকে বেশি ঝুঁকছেন। এর ফলে অলঙ্কার তৈরির কারিগর ও জুয়েলারি শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সোনা কি এখনো নিরাপদ বিনিয়োগ?
অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে সোনাকে সবসময় সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ বা ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শেয়ার বাজার বা রিয়েল এস্টেট খাতের তুলনায় সোনার দাম দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকে এবং বিপদের সময়ে দ্রুত নগদ টাকায় রূপান্তর করা যায়।
বর্তমান বাজারে সোনার যে চড়া দাম, তাতে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য সোনা এখনো একটি চমৎকার মাধ্যম হতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে মুনাফা লাভের আশায় এই মুহূর্তে বড় অঙ্কের টাকা সোনায় বিনিয়োগ করার আগে বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
বাংলাদেশে সোনার দামের এই ঐতিহাসিক বৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরই একটি প্রতিফলন। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং দেশীয় বাজারে জোগানের ঘাটতি যতদিন না কাটবে, ততদিন সোনার বাজার স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে বাজুস এই দাম পুনর্নির্ধারণ করে সাধারণ ক্রেতাদের কিছুটা স্বস্তি দেয় নাকি মূল্যের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকে।