নিউজ ডেক্স: পাবনা নিউজ ২৪
০১ জুলাই, ২০২৬ |
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের চেহারাই বদলে দিতে যাচ্ছে দেশের এভিয়েশন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং চ্যালেঞ্জিং মেগা প্রকল্প—কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিকীকরণ প্রকল্প। বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্র সৈকতকে আন্তর্জাতিক দুনিয়ার সাথে সরাসরি যুক্ত করতে বঙ্গোপসাগরের বুক ছুঁয়ে নির্মিত হচ্ছে এক অবিশ্বাস্য রানওয়ে। সমুদ্রের জলরাশি শাসন করে এবং মাটির সীমানা ছাড়িয়ে পানির ওপর নির্মিত এই বিমানবন্দরটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক এভিয়েশন হাব (Aviation Hub) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। এই মেগা প্রকল্পের কাজ বর্তমানে একদম চূড়ান্ত বা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে আর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে বিশ্বের বড় বড় ফ্লাইটের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। পাবনা নিউজ ২৪-এর বিশেষ এই দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখে নিন এই মহাযজ্ঞের খুঁটিনাটি ও সর্বশেষ বিস্তারিত আপডেট।
১. সমুদ্র বক্ষ জয় করে দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে
কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং প্রধান আকর্ষণ হলো এর রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ। এটি মূলত জাপানের কানসাই বিমানবন্দর বা হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো সমুদ্রের পানি ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে।
দৈর্ঘ্যের নতুন রেকর্ড: আগে এই বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য ছিল ৯,০০০ ফুট। এই প্রকল্পের আওতায় তা বাড়িয়ে করা হচ্ছে ১০,৭০০ ফুট। এর ফলে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (১০,৫০০ ফুট) রানওয়েকে পেছনে ফেলে কক্সবাজার বিমানবন্দরই হতে যাচ্ছে দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে।
সমুদ্রের ওপর রানওয়ে: এই বর্ধিত অংশের মধ্যে প্রায় ১,৩০০ ফুট রানওয়ে থাকবে সরাসরি সমুদ্রের মূল পানির ওপর! পাইলটদের জন্য এই রানওয়েতে বিমান অবতরণ করানো যেমন রোমাঞ্চকর হবে, তেমনি বিমানের ভেতরে থাকা দেশি-বিদেশি যাত্রীদের মনে হবে বিমানটি সরাসরি বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের ওপর আছড়ে পড়ছে।
ওয়াইড-বডি এয়ারক্রাফট অপারেশন: এই রানওয়েটি সম্পূর্ণ চালু হলে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর (Boeing 777-300ER), বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার (Boeing 787) কিংবা এয়ারবাস ৩৫০ (Airbus A350)-এর মতো বিশ্বের যেকোনো বড় বা ওয়াইড-বডি আন্তর্জাতিক বিমান পূর্ণ যাত্রী ও জ্বালানি নিয়ে এখানে অনায়াসে এবং নিরাপদে ওঠানামা করতে পারবে।
২. বিশাল সমুদ্র প্রতিরক্ষা বাঁধ ও অত্যাধুনিক লাইটিং টেকনোলজি
উত্তাল সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ, জলোচ্ছ্বাস কিংবা সামুদ্রিক ঝড় থেকে রানওয়েকে শতভাগ সুরক্ষিত রাখার জন্য প্রায় ২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বিশেষ এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাঁধ (Sea Dike) নির্মাণ করা হয়েছে।
এই বাঁধটি তৈরির জন্য সমুদ্রের তলদেশে কংক্রিটের তৈরি বিশেষ আকৃতির সিসি ব্লক (Geo-textile tubes & CC Blocks) এবং ভারী বোল্ডার ফেলা হয়েছে, যা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে রানওয়ের মাটিকে ধরে রাখবে।
এছাড়া রাতের বেলা, ভারী বৃষ্টিপাত কিংবা ঘন কুয়াশায় নিরাপদে বিমান ওঠানামার জন্য সমুদ্রের পানির ওপর অত্যাধুনিক ক্যাটস আই লাইটিং সিস্টেম বা প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং (Precision Approach Lighting System) স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ। এই লাইটগুলোর নির্দেশনা দেখে পাইলটরা নিখুঁতভাবে রানওয়ের সীমানা বুঝতে পারবেন।
৩. ঝিনুক আকৃতির আন্তর্জাতিক টার্মিনাল ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো
আন্তর্জাতিক যাত্রী এবং বিদেশী ফ্লাইটগুলো পেশাদারিত্বের সাথে পরিচালনার সুবিধার্থে ১৭,৯৫৫ বর্গমিটার আয়তনের একটি সম্পূর্ণ নতুন ও দৃষ্টিনন্দন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
দূর থেকে দেখলে মনে হবে সৈকতের বালুচরে একটি বিশাল ঝিনুক উপুড় হয়ে পড়ে আছে। এই আইকনিক ভবনের মূল অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যেই শতভাগ শেষ হয়েছে।
বর্তমানে এর ভেতরে অত্যাধুনিক ইমিগ্রেশন কাউন্টার স্থাপন, সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম, লাগেজ বেল্ট, আন্তর্জাতিক মানের ভিআইপি লাউঞ্জ, বোর্ডিং পাস ডেক্স এবং আধুনিক সিকিউরিটি স্ক্যানার সিস্টেমের চূড়ান্ত টেস্টিং ও কমিশনিংয়ের কাজ চলছে।
৪. প্রকল্পের বর্তমান স্ট্যাটাস, বাজেট ও চালুর সময়
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন সংস্থার (ICAO) আন্তর্জাতিক নিয়ম ও নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করে ইতিমধ্যেই এই বিমানবন্দরের এয়ারফিল্ডের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও সার্টিফিকেশন নেওয়া হয়েছে।
এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারের মোট বাজেট বা খরচ হচ্ছে প্রায় ১,৯০০ কোটি টাকা।
সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জানানো হয়েছে যে, সব ধরনের কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ফ্লাইটের ট্রায়াল রান সম্পন্ন করে চলতি ২০২৬ সালের শেষের দিকেই বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের যাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও পর্যটন খাতের মহাপরিকল্পনা
কক্সবাজার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপ নিলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
সরাসরি আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটি: ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রানজিট নেওয়া ছাড়াই সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে চড়ে কক্সবাজার চলে আসতে পারবেন। এতে বিদেশি পর্যটকদের সময় ও ভোগান্তি দুটোই কমবে।
ব্লু ইকোনমি ও ব্লু এভিয়েশন: এই বিমানবন্দরটি চালু হলে কক্সবাজার অঞ্চল থেকে উৎপাদিত শুঁটকি, জ্যান্ত কাঁকড়া ও হিমায়িত মাছসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক পচনশীল পণ্য কার্গো ফ্লাইটের মাধ্যমে সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করা সহজ হবে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং মৎস্যজীবীরা ব্যাপক লাভবান হবেন, যা সামগ্রিকভাবে দেশের জিডিপিতে (GDP) বড় অবদান রাখবে।
কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প শুধু একটি যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নয়ন নয়, এটি মূলত বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের সক্ষমতার এক অনন্য স্মারক। সমুদ্রের ঢেউকে শাসন করে টেকসই প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ে তোলা আমাদের প্রকৌশলীদের এক বিশাল সাফল্য। ২০২৬ সালের এই মেগা প্রকল্প পুরোপুরি আলোর মুখ দেখলে কক্সবাজার কেবল এশিয়ার নয়, বরং পুরো পৃথিবীর অন্যতম সেরা আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে। পাবনা নিউজ ২৪-এর পক্ষ থেকে দেশের এভিয়েশন খাতের এই ঐতিহাসিক ও গৌরবময় অগ্রযাত্রাকে জানাই আন্তরিক সাধুবাদ।