Home খেলাধুলা বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়েও মন জিতল জাপান: গ্যালারি পরিষ্কারের সেই অনিন্দ্য ইতিহাস ও সংস্কৃতি

বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়েও মন জিতল জাপান: গ্যালারি পরিষ্কারের সেই অনিন্দ্য ইতিহাস ও সংস্কৃতি

0
বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়েও মন জিতল জাপান: গ্যালারি পরিষ্কারের সেই অনিন্দ্য ইতিহাস ও সংস্কৃতি
ম্যাচ হেরে বিদায়, তবুও ঐতিহ্য ভুললেন না জাপানি সমর্থকেরা। অশ্রুসিক্ত চোখেই গ্যালারির আবর্জনা পরিষ্কার করে বিশ্ববাসীকে অনন্য শিক্ষা দিলেন সামুরাই ব্লু ভক্তরা।

নিউজ ডেক্স: পাবনা নিউজ ২৪

খেলার মাঠে হার-জিত থাকবেই, এটাই ফুটবলের চিরন্তন নিয়ম। কিন্তু হারের পর অপর পক্ষকে ভালোবাসা ও সম্মানের বন্ধনে বেঁধে রাখা—এটা সবাই পারে না। চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে রাউন্ড অব ৩২ (Round of 32)-এর একটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে শেষ মুহূর্তের গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে জাপান। এই হারে স্বাভাবিকভাবেই জাপানি ফুটবল দল এবং গ্যালারিতে থাকা সমর্থকেরা প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন এবং কেঁদেছিলেন। কিন্তু সেই চরম কষ্ট ও চোখের জলের মাঝেও বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল সামুরাই ব্লু সমর্থকেরা। ম্যাচ শেষে পুরো স্টেডিয়ামের গ্যালারি নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করে তারা প্রমাণ করল তাদের মহান সংস্কৃতি, যা এখন পুরো বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ ও প্রশংসায় ভাসিয়েছে।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়: তবুও গ্যালারিতে হারেনি জাপানের সংস্কৃতি

ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ৯০+ মিনিটের তুমুল লড়াইয়ের পর যখন রেফারির শেষ বাঁশি বাজল, তখন মাঠের বুকে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে জাপানের বিদায়ের স্বপ্ন। কিন্তু মাঠের সেই কষ্ট মাঠেই রেখে, গ্যালারিতে আসা হাজারো জাপানি সমর্থক নিজেদের পকেট থেকে বের করলেন সাথে করে নিয়ে আসা বিশেষ ‘নীল প্লাস্টিক ব্যাগ’। যেখানে অন্য দেশের সমর্থকেরা হারের কষ্টে কিংবা জয়ের আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে স্টেডিয়াম ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেখানে জাপানি সমর্থকেরা সারিবদ্ধ হয়ে প্রতিটি সিটের নিচে পড়ে থাকা পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, কাপ ও অন্যান্য আবর্জনা নিজ হাতে কুড়িয়ে ব্যাগে ভরতে শুরু করেন। এটি শুধু তাদের নিজেদের ফেলা ময়লা ছিল না, অন্য দলের সমর্থকেরা যে আবর্জনা ফেলে গিয়েছিলেন, তাও তারা পরম যত্নে পরিষ্কার করেন।

ড্রেসিংরুম পরিষ্কার: সামুরাই ব্লু দলের অনন্য শিক্ষা

জাপানিদের এই অসাধারণ পরিচ্ছন্নতার মানসিকতা শুধু গ্যালারিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা দেখা গেছে দলের ড্রেসিংরুমেও। ব্রাজিলের সাথে ম্যাচ হেরে বিদায় নেওয়ার আগে জাপানি খেলোয়াড়রা তাদের লকার রুম বা ড্রেসিংরুম একদম ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কার করে রেখে যান। কোথাও কোনো ময়লা, ব্যবহৃত টেপ বা কাগজের টুকরো ছিল না। শুধু তাই নয়, আয়োজক দেশকে ধন্যবাদ জানিয়ে তারা একটি ছোট ওরিগামি (কাগজের তৈরি পাখি) এবং জাপানি ভাষায় ‘ধন্যবাদ’ (আরিগাতো) লিখে একটি চিরকুটও রেখে আসেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যেই নয়, তাদের জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মজ্জাতেও মিশে আছে।

কেন জাপানিরা এত পরিষ্কার? ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট:

বিশ্বের মানুষের কাছে এটি এক পরম বিস্ময় হলেও জাপানিদের কাছে এটি তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার একটি অংশ। এর পেছনে প্রধান তিনটি কারণ রয়েছে:

ওসোজি (O-soji) বা স্কুল জীবনের শিক্ষা: জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো থেকেই শিশুদের কোনো আলাদা পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছাড়াই নিজেদের ক্লাসরুম, বারান্দা এবং বাথরুম নিজেদের হাতে পরিষ্কার করতে শেখানো হয়। একে বলা হয় ‘ওসোজি’ বা ক্লিনিং টাইম। এই শৈশবের শিক্ষাই বড় হয়ে তাদের চরিত্রে স্থায়ী রূপ নেয়।

“তাতসু তুরি এতো ও নিগোসাজু” প্রবাদ: জাপানি সংস্কৃতিতে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রবাদ রয়েছে, যার অর্থ—”একটি পাখি যখন উড়ে যায়, সে তার পেছনে কোনো নোংরা চিহ্ন রেখে যায় না।” অর্থাৎ, আপনি যেখানেই যান না কেন, স্থানটি যেভাবে পেয়েছিলেন ঠিক সেভাবেই অথবা তার চেয়েও পরিষ্কার করে রেখে আসা আপনার দায়িত্ব।

মেইওয়াকু (Meiwaku – অন্যকে বিরক্ত না করা): জাপানিরা মনে করেন, তাদের ফেলে যাওয়া আবর্জনার কারণে স্টেডিয়ামের পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা অন্য কোনো মানুষের যেন বিন্দুমাত্র কষ্ট বা সমস্যা না হয়। কাউকে বিরক্ত না করার এই মানসিকতাই তাদের সমাজের অন্যতম বড় ভিত্তি।

বিশ্ববাসী ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসার ঝড়

জাপানি সমর্থকদের এই মহৎ কাজের ভিডিও ও ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই তা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তাদের এই মননশীলতাকে স্যালুট জানাচ্ছেন। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA) তাদের অফিশিয়াল পেজ থেকে জাপানিদের ধন্যবাদ জানিয়ে পোস্ট করেছে। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, “জাপান হয়তো ফুটবল মাঠে হেরে গেছে, কিন্তু মানুষের মন জয় করার দিক থেকে তারাই আসল বিশ্বজয়ী।” মূলত ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রতিটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে জাপানিরা এই অনন্য ঐতিহ্য বজায় রেখে আসছেন।

জাপান ফুটবল মাঠে হয়তো ট্রফি জিততে পারেনি, কিন্তু তাদের এই ‘ক্লিনলিনেস’ বা পরিচ্ছন্নতার ভাবনা দিয়ে বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মন জিতে নিয়েছে। পুরো বিশ্ব যখন মেকি জৌলুস আর জয়-পরাজয়ের সমীকরণে ব্যস্ত, তখন জাপান আমাদের শেখাচ্ছে কীভাবে মানবিক, সুশৃঙ্খল ও সরল থাকতে হয়। পাবনা নিউজ ২৪-এর পক্ষ থেকে সামুরাই ব্লু দল ও তাদের অসাধারণ সমর্থকদের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও শুভকামনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here